মঙ্গলবার

১৬ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
৩রা বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
spot_img

একুশের কবি সুকান্ত আজও জীবন্ত শিশুকণ্ঠে

শিতাংশু ভৌমিক অংকুর

২১ বছরের জীবন পেয়েছিলেন গণমানুষের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। এর মধ্যে মাত্র ৬-৭ বছর লেখার সময় পেয়েছিলেন। তাছাড়া আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে বেশি লেখাপড়াও করতে পারেননি। তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করতে পারেননি। অথচ বাংলা সাহিত্যে তিনি যে অবদান রেখে গেছেন তা অতুলনীয়, অবিস্মরণীয়। আজ ১৫ আগস্ট এই প্রতিবাদী কিশোর কবির ৯৪তম জন্মবার্ষিকী। তাঁকে হৃদয়ের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

প্রগতিশীল চেতনার কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্ম ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট তাঁর মাতামহের বাড়ি কলকাতার কালিঘাটে। তবে তাঁর পৈতৃক নিবাস বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায়। তাঁর পিতার নাম নিবারণ ভট্টাচার্য এবং মায়ের নাম সুনীতি দেবী। কালিঘাটের মহিম হালদার স্ট্রীটের এক নিম্নবিত্ত পরিবারে সুকান্তের জন্ম। বেলেঘাটা দেশবন্ধু স্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। তবে তাতে অকৃতকার্য হয়েছিলেন। এ সময় ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ায় তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে।

সুকান্তের বাল্যবন্ধু ছিলেন কবি অরুণাচল বসু। ‘সুকান্ত সমগ্র’তে লেখা সুকান্তের চিঠিগুলোর বেশিরভাগই অরুণাচল বসুকে লেখা। অরুনাচল বসুর মা কবি সরলা বসু সুকান্তকে পুত্রস্নেহে দেখাশোনা করতেন। কবির জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কেটেছিল কলকাতার বেলেঘাটার ৩৪ নং হরমোহন ঘোষ লেনের বাড়িতে। সেই বাড়িটি এখনো অক্ষত আছে। কাছেই কবির ভাইদের মধ্যে দুজন বিভাস ভট্টাচার্য ও অমিয় ভট্টাচার্যের বাড়ি। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ছিলেন সুকান্তের ভ্রাতুষ্পুত্র।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেতাল্লিশের মম্বন্তর, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতির বিরুদ্ধে সুকান্ত সোচ্চার কলম ধরেছিলেন। ১৯৪৪ সালে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। সে বছর আকাল নামক একটি সংকলন গ্রন্থ তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল। কৈশোর থেকেই সুকান্ত ভট্টাচার্য যুক্ত হয়েছিলেন সাম্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে। পরাধীন দেশের দুঃখ-দুর্দশা জনিত বেদনা এবং শোষণমুক্ত স্বাধীন সমাজের স্বপ্ন, শোষিত মানুষের কর্ম জীবন এবং ভবিষ্যত পৃথিবীর জন্য সংগ্রাম তাঁর কবিতার মূল প্রেরণা।

মৃত্যুর ৬ বছর আগে ১৯৪১ সালে সুকান্ত ভট্টাচার্য কলকাতা রেডিওর গল্পদাদুর আসরের যোগদান করেন। সেখানে প্রথমে তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করেন। রবি ঠাকুরের মৃত্যুর পর সেই আসরেই তিনি নিজের লেখা কবিতা পাঠ করে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান। গল্পদাদুর আসরের জন্য সেই বয়সেই তাঁর লেখা গান মনোনীত হয়েছিল আর তাঁর সেই গান সুর দিয়ে গেয়েছিলেন সেকালের অন্যতম সেরা গায়ক পঙ্কজ মল্লিক।

সুকান্ত ভট্টাচার্যকে আমরা কবি হিসেবেই জানি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যেমন কেবল মাত্র কবি ছিলেন না, সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে তাঁর ছিলো অবাধ বিচরণ, তেমনি সুকান্ত ভট্টাচার্যও কিশোর বয়সেই লিখেছিলেন কবিতা ছাড়াও, গান, গল্প, নাটক এবং প্রবন্ধ। তার ‘ছন্দ ও আবৃত্তি’ প্রবন্ধটি পাঠেই বেশ বোঝা যায় ওই বয়সেই তিনি বাংলা ছন্দের প্রায়োগিক দিকটিই শুধু আয়ত্বে আনেননি, তা নিয়ে ভালো তাত্ত্বিক দক্ষতাও অর্জন করেছিলেন।

আট-নয় বছর বয়স থেকেই সুকান্ত লিখতে শুরু করেন। স্কুলের হাতে লেখা পত্রিকা ‘সঞ্চয়ে’ একটি ছোট্ট হাসির গল্প লিখে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর কিছুদিন পরে বিজন গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শিখা’ নামক কাগজে প্রথম ছাপার মুখ দেখে সুকান্তের লেখা ‘বিবেকান্দের জীবনী’। মাত্র এগার বছর বয়সে ‘রাখাল ছেলে’ নামে তিন একটি গীতি নাট্য রচনা করেন। এটি পরে তার ‘হরতাল’ বইতে সংকলিত হয়। ওই সময়ে পাঠশালাতে পড়াকালেই ‘ধ্রুব’ নাটিকার নাম ভূমিকাতে অভিনয় করেছিলেন সুকান্ত। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বন্ধু লেখক অরুণাচল বসুর সঙ্গে মিলে আরেকটি হাতে লেখা কাগজ ‘সপ্তমিকা’ সম্পাদনা করেন। অরুণাচল তাঁর আমৃত্যু বন্ধু ছিলেন।

মার্কসবাদী চেতনায় আস্থাশীল কবি হিসেবে সুকান্ত কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থান করে নেন। সুকান্তকে বলা হয় গণমানুষের কবি।

অসহায়-নিপীড়িত সর্বহারা মানুষের সুখ, দুঃখ তাঁর কবিতার প্রধান বিষয়। অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের স্বার্থে ধনী মহাজন অত্যাচারী প্রভুদের বিরুদ্ধে নজরুলের মত সুকান্তও ছিলেন সক্রিয়। যাবতীয় শোষণ-বঞ্চনার ও নিপীড়নের বিপক্ষে সুকান্তের ছিল দৃঢ় অবস্থান। তিনি তাঁর কবিতার নিপুণ কর্মে দূর করতে চেয়েছেন শ্রেণী বৈষম্য। মানবতার জয়ের জন্য তিনি লড়াকু ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। অসুস্থতা, অর্থাভাব তাঁকে কখনো দমিয়ে রাখতে পারেনি। মানুষের কল্যাণের জন্য সুকান্ত ভট্টাচার্য নিরন্তর নিবেদিত থেকেছেন। তিনি মানবিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বিদ্রোহের ডাক দিয়েছেন। তাঁর অগ্নিদীপ্ত সৃষ্টি প্রণোদনা দিয়ে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে প্রয়াসী ছিলেন।

মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কাব্যধারার প্রচলিত প্রেক্ষাপটকে আমূল বদলে দিতে পেরেছিলেন। সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা দৈনিক স্বাধীনতার ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনা করতেন। মার্কসবাদী চেতনায় আস্থাশীল কবি হিসেবে সুকান্ত কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থান দখল করে নেন। তাঁর কবিতায় অনাচার ও বৈষ্যমের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ পাঠকদের হৃদয়কে আন্দোলিত করে তোলে। গণমানুষের প্রতি গভীর মমতায় প্রকাশ ঘটেছে তাঁর কবিতায়।

স্বল্প সময়ের জীবন পেলেও সুকান্ত ভট্টাচার্য অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর রচনাবলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল- ছাড়পত্র (১৯৪৭), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠেকড়া (১৯৫১), অভিযান (১৯৫৩), ঘুম নেই (১৯৫৪), হরতাল (১৯৬২), গীতিগুচ্ছ (১৯৬৫) প্রভৃতি। পরে উভয় বাংলা (পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ) থেকে ‘সুকান্ত সমগ্র’ নামে তাঁর রচনাবলি প্রকাশিত হয়। সুকান্ত ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পিসঙ্ঘের পক্ষে আকাল (১৯৪৪) নামে একটি কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনা করেন।

সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা বিষয়বৈচিত্র্যে ও লৈখিক দক্ষতায় অনন্য। সাধারণ বস্তুকেও সুকান্ত কবিতার বিষয় করেছেন। বাড়ির রেলিং ভাঙা সিঁড়ি উঠে এসেছে তাঁর কবিতায়। তাঁরর কবিতা সব ধরনের বাধা-বিপত্তিকে জয় করতে শেখায়। যাপিত জীবনের দুঃখ-যন্ত্রণাকে মোকাবেলা করার দুর্বার সাহস সুকান্তের কবিতা থেকে পাওয়া যায়। তারুণ্যের শক্তি দিয়ে উন্নত শিরে মানুষের মর্যাদার জন্য মানুষকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান সুকান্তের কবিতায় লক্ষণীয়। সুকান্তের কবিতা সাহসী করে, উদ্দীপ্ত করে। তার বক্তব্যপ্রধান সাম্যবাদী রচনা মানুষকে জীবনের সন্ধান বলে দেয়। স্বল্প সময়ের জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্যকে অনেক কিছু দিয়ে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, দিজেন্দ্রলাল রায়, জীবনানন্দ দাশসহ সে সময়ের বড় বড় কবির ভিড়ে তিনি হারিয়ে যাননি। নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন নিজ প্রতিভা, মেধা ও মননে। সুকান্ত তাঁর বয়সিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেছেন তাঁর পরিণত ভাবনায়। বস্তুত, ভাবনাগত দিকে সুকান্ত তাঁর বয়স থেকে অনেক বেশি এগিয়ে ছিলেন।

বিপ্লব ও স্বাধীনতায় আপোসহীন সংগ্রামী কবি সুকান্ত ছিলেন কমুনিস্ট পার্টির সারাক্ষণের কর্মী। পার্টি ও সংগঠনের কাজে অত্যধিক পরিশ্রমের ফলে নিজের শরীরের ওপর যে অত্যাচার তিনি করেছিলেন, তাতে তাঁর শরীরে প্রথম ম্যালেরিয়া ও পরে দুরারোগ্য ক্ষয়রোগ বাসা বাঁধে। ১৯৪৭ সালের ১৩ মে মাত্র ২১ বছর বয়সে কলকাতার ১১৯ লাউডট স্ট্রিটের রেড এড কিওর হোমে মৃত্যুবরণ করেন।

লেখক: তরুণ সংবাদকর্মী।

spot_img

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ

spot_img