ঢাকা, বাংলাদেশ ।

শুক্রবার, আগস্ট ১২, ২০২২

মুক্তিযুদ্ধের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল বলেন, ‘জঙ্গি মৌলবাদীরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শুধু নয়, ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের মূল্যে অর্জিত ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সকল শক্তিকে ’৭১-এর মতো ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’

শহীদজননী জাহানারা ইমামের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির মানিকগঞ্জ জেলা শাখা আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন কাজী মুকুল ।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি এডভোকেট দীপক কুমার ঘোষের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসাইন খান এর সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মানিকগঞ্জ জেলা সভাপতি কমরেড অধ্যাপক আবুল ইসলাম সিকদার, উদীচী মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান মামুন, সপ্তসুর-এর সভাপতি অধ্যাপক বাসুদেব কুমার সাহা, মানিকগঞ্জ কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন, জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান শ্রীমতী লক্ষ্মী চ্যাটার্জী প্রমুখ ।
এ ছাড়াও সভায় উপস্থিত ছিলেন নির্মূল কমিটির ঘিওয়র উপজেলার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ইয়াকুব হোসেন, মানিকগঞ্জ জেলার দফতর সম্পাদক ইকবাল খান, আইন সম্পাদক মাহাবুবুল আলম রাসেল, সদস্য মজিবর রহমান মাস্টার, শাহাদৎ হোসেন মাস্টার, পংকজ পাল প্রমুখ ।

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে কাজী মুকুল উপস্থিত সকলকে শহীদজননীর জন্মবার্ষিকী শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ‘রাজনৈতিক শক্তির দুঃখজনক অবনতি হয়েছে। মৌলবাদীদের প্রতিরোধে অবিলম্বে রাজনীতিবিদদের নিজস্ব স্বক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। মৌলবাদীদের জিহাদ ভাইরাস হয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক বিকাশ, বাঙালির আত্মপরিচয়, নিজস্ব সংস্কৃতি ও নারী অগ্রগতি সহ মানবতার জন্য জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে মৌলবাদীরা এই জিহাদ ভাইরাসকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে। সাধারণ চোখে প্রতিটি মৌলবাদী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড আলাদা মনে হলেও এরা সকলেই এক ছাতার নিচে একই সাম্প্রদায়িক এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের পূর্বের জঙ্গিদমন কার্যক্রম জোরালো ছিল কিন্তু মৌলবাদের ডিজিটাল আগ্রাসন রুখতে তেমন কোনো জোরালো কর্মসূচি দৃশ্যমান নয়।’

সম্প্রতি আলোচিত মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস তদন্তে গণকমিশন কর্তৃক প্রকাশিত ‘শ্বেতপত্র: বাংলাদেশে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ২০০০ দিন’ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি শ্বেতপত্রটি দুদক ও মানবাধিকার কমিশনে জমা দেওয়ার পর মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর আস্ফালন বেড়ে গেছে। এদের সম্পর্কে সবাইকে সজাগ থাকতে। স্থানীয়দের বোঝাতে হবে কিভাবে এই মৌলবাদী শক্তি ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আমাদের দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করছে।’

তিনি বলেন, ‘গণকমিশন সম্পর্কে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন ‘গণকমিশনের আইনি কোনো ভিত্তি নেই’। এ বিষয়ে আমাদের বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার। আমরা কখনও দাবি করিনি আমাদের গণকমিশন দেশের আইন দ্বারা গঠিত কোনো প্রতিষ্ঠান। আমাদের নামেই বলা হয়েছে এটি ‘গণকমিশন সরকার কর্তৃক গঠিত কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। এ ধরনের কমিশন অতীতে বহুবার গঠন করা হয়েছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক গণকমিশন বা গণআদালত বহু দেশে গঠিত হয়েছে, সমস্যা নিরসনে জনমত সংগঠনের পাশাপাশি কর্তৃপক্ষকে এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার জন্য। আমাদের গণকমিশনের আইনি ভিত্তি না থাকলেও এর রাজনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি অবশ্যই আছে।

আমরা অতীতে এরকম আরও ৬টি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছি। কিন্তু তখন তারা কিছু বলে নাই। এবার তাদের আস্ফালনের কারণ হলো আমরা এবার তাদের অর্থনৈতিক উৎস এবং আয়কর দেবার কথা বলেছি। এতে তাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এখন তারা তাদের ইউটিউব চ্যানেলে ভুল তথ্য উপস্থাপন করছেন। তারা জাতীয় ব্যক্তিত্ব যেমন ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম, অভিনেতা সাকিব খানসহ পুরাতন ভিডিও এডিট করে প্রকাশ করছে যে তারা ১১৬ আলেমের তালিকা নিয়ে কথা বলেছে। তাদের পূর্বের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বা ব্যক্তিগত জীবনের ইসলাম ধর্ম নিয়ে বক্তব্যগুলো কেটে এখানে যুক্ত করে দিয়েছেন। এমনকি তারা ২ বছর আগে আমাদের দাবির পক্ষে সংসদে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যও নিজেদের পক্ষের বক্তব্য বলে প্রচার করছেন।

অ্যাডভোকেট দীপক কুমার ঘোষ বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী ’৭১ সালে তাদের যাবতীয় মানবতাবিরোধী অপরাধকে ইসলামের নামে বৈধতা দিতে চেয়েছে এবং ইসলামের নামে তারা গণহত্যা ও নারীধর্ষণ করেছে। জামায়াত-হেফাজতের জাতি ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমের সমালোচনা কখনও ইসলামবিরোধী হতে পারে না।’

নারীনেত্রী লক্ষী চ্যাটার্জী বলেন, ‘জামায়াত হেফাজত সব সময় প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। মুজিবশতবর্ষ ও স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতেও তারা থেমে থাকেনি। ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকবে কিন্তু সেচ্ছাচারিতা থাকবে না। ধর্মীয় সভায় রাজনৈতিক ও স্বাধীনতাবিরোধী বক্তব্য প্রদান বন্ধ করতে হবে। ইসলামের নাম ও ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি করা নিষিদ্ধ করতে হবে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসাইন খান বলেন, শহীদজননী জাহানারা ইমাম নির্মূল কমিটি গঠন করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত করেছিলেন, সেই কারনে জননেত্রী শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে সক্ষম হয়েছেন। মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে এখন শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। কওমী, নূরানী ও আলীয়া মাদ্রাসা শুধু নয় ইংরেজী সহ সকল শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের বরেণ্য ব্যক্তিদের ইতিহাস, বিজ্ঞান, ইংরেজী, গণিত, ভূগোল দশম শ্রেণি পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী অসাম্প্রদায়িক শিক্ষকদের বাছাই করে নিয়োগ দিতে হবে। সকল শিক্ষা বোর্ড ও কর্মচারীদের সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে। নতুন কোন স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির ইত্যাদি নির্মাণে সরকারের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করতে হবে।

আবুল ইসলাম সিকদার বলেন, ‘স্বাধীনতার পূর্বে ও পরে ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলো সবসময় স্বাধীনতাবিরোধী ছিল। হেফাজত-জামাতের জঙ্গি তৎপরতা সচেতন নাগরিক সমাজ ও সরকারকে শক্ত হাতে দমন করতে হবে।’

উদীচী মানিকগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মামুন বলেন, ‘মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে শিক্ষা এবং সংস্কৃতির লড়াই-এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে তোলার বিকল্প নেই।’

আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ