শুক্রবার

১৪ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
spot_img

গাঁজায় বুদ কিশোর-কিশোরীরা, সৃজনশীল শক্তির হ্রাস

শিতাংশু ভৌমিক অংকুর,

বর্তমান পৃথিবী যে কয়টি মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন তার মধ্যে মাদকাসক্তি অন্যতম। পৃথিবী জুড়ে আজ মাদকাসক্তি একটি জটিল সামাজিক ব্যাধিরূপে বিস্তার লাভ করেছে। আমাদের সমাজে এই দূরারোগ্য ব্যাধির তীব্রতা আরো বেশি প্রবল। এর শিকার হয়ে দেশের যুব সমাজ তাদের জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে। দিন যত যাচ্ছে এর ভয়াবহতা আরো বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদকদ্রব্য হচ্ছে সেসব দ্রব্য বা বস্তু যা গ্রহণের ফলে মানুষের স্বাভাবিক আচরণের পরিবর্তন ঘটে। শুধু তাই নয়, এসব দ্রব্যের প্রতি তাদের এক ধরণের নেশার সৃষ্টি হয়। মাদকদ্রব্য গ্রহণ করে নেশা সৃষ্টি করাকে মাদকাসক্তি বলে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর মতে, মাদকাসক্তি হচ্ছে চিকিৎসা গ্রহণযোগ্য নয় এমন দ্রব্য অতিরিক্ত পরিমাণে ক্রমাগত বিক্ষিপ্তভাবে গ্রহণ করা এবং এসব দ্রব্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া। মাদক দ্রব্যসামগ্রী বিশেষ করে গাঁজার প্রতি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের আকর্ষণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদকদ্রব্য প্রয়োগে মানবদেহে মস্তিষ্কজাত সংজ্ঞাবহ সংবেদন হ্রাস পায় এবং বেদনাবোধ কমায়। তাই এগুলো কখনও কখনও বেদনানাশক হিসেবে চিকিৎসায় ব্যবহিত হয়।কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে মাদকদ্রব্যে মুখ্য ভেষজক্রিয়া ঘটে। চিকিৎসাগত ব্যবহারের দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বেদনানাশ হিসাবে । কিন্তু মাদকদ্রব্যের বেদনানাশক ক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকে তন্ত্রাচ্ছন্নতা, আনন্দোচ্ছাস, মেজাজ পরিবর্তন, মানসিক আচ্ছন্নতা, শ্বাস-প্রশ্বাসের অবনমন, রক্তচাপ হ্রাস, বমি, কোষ্ঠবদ্ধতা ও মূত্র হ্রাস, অন্তঃক্ষরাগ্রন্থি ও স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের ক্রিয়াকলাপের পরিবর্তনসহ অনেকগুলো অবাঞ্ছিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। এই প্রতিক্রিয়াগুলোর সবটাই মাদক গ্রহণের মাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং মাদকের ধরন অনুসারে এগুলোতে যথেষ্ট পার্থক্য দেখা যায়।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় মাদক দ্রব্য গুলোর অন্যতম ও সহজলভ্য হচ্ছে গাঁজা যা প্রতিনিয়ত কিশোর ও তরুণ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে জীবনে চলার পথে। পৃথিবীর ইতিহাসে গাঁজার অনেক ব্যবহার আছে এবং এখনও পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশ গাঁজাকে বৈধ ওষুধ ও বিনোদনের উপকরণ হিসাবে ব্যবহার করার অনুমতি আছে। কিন্তু এটা তো দু’টো পজেটিভ দিক বললাম এর বিপরীতে রয়েছে অনেক গুলো নেগেটিভ দিক যার কারণে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই গাঁজা কে অবৈধ হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং গাঁজা সেবন কে অপরাধ বলে বিবেচনা করেন। গাঁজার নিয়মিত ব্যবহারে কিশোরদের মধ্যে সিজোফ্রেনিয়া সহ নানা ধরণের মানসিক সমস্যা তৈরি হয়।কিশোর এবং তরুণদের মস্তিষ্ক ক্রমাগত উন্নয়ন হতে থাকে; তাই নিয়মিত গাঁজার ব্যবহারে তাদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।কমবেশি গাঁজা সেবন করলেই পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, তবে প্রায়ই পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় দীর্ঘদিন ধরে সেবন করলে। যে পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া দেখা যায় তা হলো চোখ ও হাতের সমন্বয়ের দুর্বলতা, যার ফলে গাড়ি চালানো, মেশিনের কাজ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। প্রজনন অমতা, হৃত্‍স্পন্দন বৃদ্ধিতে আতঙ্কগ্রস্ত হওয়া এবং দৃষ্টি ও সময় অনুধাবনে বিভ্রান্তিজনিত অস্থিরতা, মানসিক বৈকল্য ও অবসাদগ্রস্ততাও দেখা দেয়।

তামাকের চেয়ে গাঁজা অধিক বিপদজনক কারণ গাঁজা সেবনের সময় সিগারেটের তুলনায় ফুসফুসে অন্তত তিন থেকে চারগুণ বেশি কার্বন-মনোঅক্সাইড ও অন্যান্য ক্ষতিকারক পদার্থ জমা হয়। সিগারেটে যে পরিমান ক্ষতিকর পদার্থ থাকে তার চেয়ে চার পাঁচ থেকে দশ গুণ বেশি থাকে গাঁজায়। ফলে গাঁজা সেবীদের ফুসফুসে ও শ্বাসনালীতে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। গাঁজা সেবনে রোগ প্রতিরোধ মতা কমে যাবার ফলে সেবনকারীর সংক্রামক রোগ বেশি হয় এবং ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসজনিত রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। গবেষণায় দেখা যায় কোন গাঁজা সেবনকারীর সেবনের প্রথম ১ ঘণ্টায় হার্টর্এ্যাটাকের ঝুঁকি সাধারণ অবস্থার চেয়ে চারগুণ বেড়ে যায়, কারণ সেবনের ফলে রক্ত চাপ ও হৃত্‍কম্পন বেড়ে যায়।

এই মাদকটি গ্রহণে দৃষ্টিভ্রম, বাচালতা, মাংশপেশীর অনিয়ন্ত্রিত ও অপ্রয়োজনীয় সংকোচন, দিকভ্রান্ত হওয়া, মাথা ঘুরা, ক্ষুধা লাগা, গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে যাওয়া, সময়জ্ঞান হারানো থেকে শুরু করে প্রলাপ বকা, বিকার আসা এমনকি মানুষকে হত্যাকরার ইচ্ছাও জাগ্রত হতে পারে। মাত্রা বেশি হয়ে গেলে অনেক সময় হাত পা এর নড়াচড়ার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা, হাতে পায়ে ঝি ঝি ধরা এবং অবশ হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে যাওয়া থেকে শ্বাস কষ্ট হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। যদি কোন নারী গর্ভাবস্থায় গাঁজা সেবন করে তবে সাধারণত এর প্রভাব তাদের শিশুদের উপরও পড়ে। শিশুদের জ্ঞানের ঘাটতি সহ আরো অন্যান্য সমস্যা দেখা দেয়।যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের ২০ বছর গবেষণা চালিয়ে ফলাফলে দাবি করেছেন, গাঁজা মানুষের স্মৃতিশক্তি নষ্ট করে দেয়। কারণ, গাঁজা মস্তিষ্কের কোষ নষ্ট করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। দীর্ঘদিন গাঁজা সেবনের অভ্যাস স্মৃতিশক্তিকে ক্রমশ দুর্বল করে দেয়।

তবে এ নিয়ে ভিন্ন মতও রয়েছে।‘ আমেরিকান হার্ট এসোসিয়েশন’-এর গবেষণায় দেখা গেছে গাঁজা সেবনের ফলে মানুষের শরীরের ধমনী ও শিরা অনেকাংশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সিগারেটের মতো করে গাঁজা ধোঁয়া টানার ফলে মানুষের স্বাভাবিক রক্ত চলাচল প্রক্রিয়া বাধাপ্রাপ্ত হয়। অতএব, বোঝাই যাচ্ছে গাঁজা(মাদক) কেন্দ্রিক যে ক্ষতি হয় তা অপূরনীয় কারণ একজন কিশোরের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ ঘটানোর জন্য প্রধান প্রতিবন্ধকতা গাঁজা সৃষ্টি করে তা বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। গাঁজা বাংলাদেশে সহজ লভ্য ও সহজে হাতের নাগালে পাওয়া যায় বলে অল্প টাকায় এই নেশায় বুদ হয়ে আছে এদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থী সমাজ যাদের অধিকাংশই কিশোর বয়সী। বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীদের শিক্ষা জীবনে বাধা ও তাদের মানসিক বিকাশের অবিচ্ছেদ্য যাত্রা পথ কে অবরুদ্ধ করে রাখার জন্য গাঁজা নামের মাদক নিজেই যথেষ্ট। গাঁজা মানুষের মৌলিক চাহিদাকে পাত্তা না দিয়ে মানুষকে নেশায় বুদ করে রেখে তার খাবারের রুচিহীনতা, উশৃংখল ও অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনের প্রধান উপকরণ হিসাবে কাজ করছে।

_ দপ্তর, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক,কবি নজরুল সরকারি কলেজ সাংবাদিক সমিতি।

spot_img

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ

spot_img