• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ৬ই অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২০ মে, ২০২২
সর্বশেষ আপডেট : ২০ মে, ২০২২

মৃত্যুহীন প্রাণ

নিজস্ব প্রতিনিধি

অআবদুল গাফফার চৌধুরী নেই, একথা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তিনি তো যথেষ্ট পরিণত বয়সেই মৃত্যুবরণ করেছেন। মোমবাতির মতন আলো জ্বালাতে জ্বালাতে একেবারে শেষে এসেও আলোই দিয়ে গেছেন।আজ থেকে সত্তর বছর আগে ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে যিনি কালজয়ী ভাষা সঙ্গীত রচনা করে অমরত্বের চাবিটা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন, তার মৃত্যুটাকে তো আর অকাল মৃত্যু বলা যায় না। তবুও আমাদের এই আকালের দিনে তার এই চলে যাওয়াটা অকাল মৃত্যুরই সামিল। এমন মানুষের মৃত্যু সবসময়ই অকাল মৃত্যু। এরা আমাদের সাধারণের মতো কখনই সংসারের বোঝা হয়ে ওঠেন না, বরং বাংলাদেশ নামক সংসারের হৃৎপিণ্ডে রক্ত সঞ্চালনের জন্য এবং জাতীয় শোভা বর্ধনের জন্য অনাদিকাল পর্যন্ত এরা প্রয়োজনীয়।

আবদুল গাফফার চৌধুরী সম্পর্কে আমি আসলে বিশেষ কিছুই জানি না। না জানার সুবিধা হলো চোখবুঁজেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিস্তর লেখা যায়। জেনে বুঝে লিখতে গেলে লেখা বাহুল্য বর্জিত হয়, তথ্য সমৃদ্ধ হয়। আর না জেনে লিখলে লেখা আকৃতিতে বড় হলেও বড়জোর তাতে পাস নম্বর পাওয়া যায়, ক্রেডিট নম্বর পাওয়া যায় না। গাফফার চৌধুরী এমনই বিখ্যাত মানুষ যে কেউ তার সম্পর্কে বানিয়ে লিখেও পাস নম্বর পেতে পারে।

যদি বলি তিনি ছিলেন মস্ত বড় সাংবাদিক, কলামিস্ট, যদি বলি তিনি ছিলেন কবি, গীতিকার উপন্যাসিক,এবং যদি বলি একজন রাজনীতিবিদ! এবং শেষে যদি বলি তিনি ছিলেন একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব তাহলে এর কোনটিই ভুল হবে না। তাঁর সম্পর্কে বিশেষ কিছু না জেনেও এসব কথা বলা যায়। তিনি বরিশালের ছেলে। কিন্তু আলো ছড়িয়েছেন সারা দেশব্যাপী এবং কখনো কখনো বিশ্বব্যাপী।

সবকিছু ছাপিয়ে গাফফার চৌধুরী ছিলেন একজন প্রথিতযশা নির্ভীক সাংবাদিক এবং কলামিস্ট, এটাই তাঁকে বিখ্যাত করে তুলেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তার অবদান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের যে কোন সংকট কালে তার দিক নির্দেশনা মূলক লেখা এদেশের মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো পাঠ করেছে। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে যে যেমন করে পারে সেখান থেকে পাঠ নিয়েছে।তিনি পালন করেছেন বিবেকের ভূমিকা।

জনাব চৌধুরীর বিশ্লেষণ ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। তিনি প্রতিনিয়ত বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে যেন খেলেছেন। সবই যেন তার জানা বোঝার সীমানার মধ্যে। ঘটনার অণু পরমাণু এবং ইলেকট্রন প্রোটন যেন তিনি একেবারে ডিসেকশন করে দেখিয়ে দিয়েছেন। সে বিশ্লেষণ সম্পর্কে কেউ দ্বিমত পোষণ করতে পারেন, তবে হঠাৎ করে যেন তার বিপরীতে তেমন কিছুই বলার থাকতো না। বিশ্লেষণের প্রতিটি শব্দে, প্রতিটি লাইনে তিনি যেনো এক মোহময়তা ছড়িয়ে যেতেন।

আজ এই সদ্য শোকের মুহূর্তে আমি তাঁর সম্পর্কে আর অধিক কিছু বলতে চাই না। কারণ তাতে একটুখানি সমালোচনার আঁচড় লাগলে আমার নিজেরও যেমন খারাপ লাগবে তেমনি গাফফার চৌধুরীর ভক্ত বৃন্দ অসন্তুষ্টও হতে পারেন। তাঁর প্রতি আমারও ব্যক্তিগত ভক্তি শ্রদ্ধার কোন পরিসীমা নেই। কিন্তু একটা কষ্ট সবসময়ই আমাকে পীড়া দিয়ে যায় । সেটি আমার একান্ত নিজের কষ্ট। ওটার জন্য তাঁর মতো কিংবদন্তি সাংবাদিককে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবার ধৃষ্টতা আমার নেই। বোধহয় তাঁকে শ্রদ্ধার আসন থেকে একটুও নড়াতে চাইনি বলেই এই কষ্টটা পেয়েছি। আমার কেবলই মনে হয়েছে, তিনি যেনো একটি ঘরনার হয়ে গিয়েছিলেন। মানুষ তো আসলে ঘরনার উর্ধ্বে উঠতেও পারে না। কিন্তু তাঁকে যদি কখনো উচিতের চেয়ে একচোখা মনে হয়, তখন তাঁর উচ্চতর আসনটি প্রবল ভক্তের সামনেও কেমন যেন নড়েচড়ে ওঠে। আমার এই একান্ত বোধের সাথে আমি কাউকেই একমত হওয়ার জন্য সামান্য জোর খাটাবো না। কারণ গ্রামে দেখেছি বিশাল খড়ের গাদার মাথাটা কোন কারণে একদিকে একটু ঝুঁকে পড়লেও মাসের পর মাস ওভাবেই থাকে, একেবারে পড়ে যায় না।

আমার দ্বিতীয় কষ্টটা হলো তাঁর দীর্ঘতর প্রবাস জীবন।
যাঁর হাত দিয়ে লেখা হয় ” আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানোর ” মতো কালজয়ী গান তার কন্ঠেই তো গীত হবে ডি এল রায়ের ” আমার এই দেশেতে জন্ম যেনো এই দেশেতে মরি” এই মহত সংগীতটি। কেউ চিকিৎসা করাতে গিয়ে বিদেশের মাটিতে মৃত্যুবরণ করতেই পারেন। কিন্তু গাফফার চৌধুরী সাহেবের শেষনিঃশ্বাসটি যে এদেশে পড়বে না তা কেন আগেই আমাদের নিশ্চিত হতে হলো, সেটাই দুঃখ।

গাফফার চৌধুরী সাহেবের এই স্বেচ্ছা নির্বাসনের কারণ আমার জানা নেই। কারণ আসলেই আমি তাঁর সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানি না। কিন্তু এ সম্পর্কে কোন কারণই আমার মতো গোঁয়ারের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। এদেশে কি তাঁর জীবনের ঝুঁকি ছিল? থাক, তাতে কি! জীবন যার আছে, অন্তত গাফফার চৌধুরীর মতো মূল্যবান জীবন যার আছে তার তো ঝুঁকি থাকবেই। আর সেই ঝুঁকিকে মাথায় নিয়েই তো ত্রিকাল জয়ীদের স্বদেশের মাটি আঁকড়ে থাকতে হয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী হতে হলে তাঁর এই মহান আদর্শও মানতে হবে।

আবদুল গাফফার চৌধুরীকে এদেশে দেখাশোনার কেউ ছিল না? কেন তিনি তো কালেভদ্রে এদেশে এসেছেন। মানুষ তাঁকে কী পরিমাণ মাথায় করে রাখে তা-ও স্বচক্ষে দেখেছেন। তাছাড়া তাঁর মতো কিংবদন্তির এসব তুচ্ছ কারণ একেবারেই মানায় না। আমার কেবলই মনে হয়েছে যে, তিনি যেনো একটি নিরাপদ গাছের আগায় বসে বাংলাদেশের বন্যা, খরা দেখে যাচ্ছেন। অনেক সময় তাঁর মতো মানুষ সম্পর্কে এসব প্রশ্ন মনে উদয় হওয়াটাকেও পাপের মতো মনে হয়েছে। কিন্তু মন তো আমার নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সে তো কেবল প্রকাশ অযোগ্য অভদ্র ভাবে প্রশ্নের পর প্রশ্ন তুলে যায়। মনকে তৃপ্ত করার জন্য অনেক বিজ্ঞজনের দ্বারস্থ হয়েছি কিন্তু এর কোন ভালো উত্তর পাইনি। শেষে নিজেই উত্তর দিয়েছি। ঠিকই তো আছে। গাফফার চৌধুরীর মতো মানুষ লন্ডনে বসবাস করবে না তো আমাদের মতো সলিমদ্দি কলিমউদ্দি সেখানে বাস করবে? কোন কারণ দর্শানো ছাড়াই তিনি সেখানে বসবাস করতে পারেন।

আজ ছোট মুখে একটা বড় কথা বলতে পারি। আমাকে যদি স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী একটা টিকেট এবং সেখানে বাড়ি গাড়ি দিয়ে আরাম আয়েশে আজীবন বসবাসের সুযোগ দান করেন, তাহলেও আমি কালিগঙ্গা ব্রীজের উপর দাঁড়িয়ে সে টিকেট খানা ছিঁড়ে নির্দ্বিধায় জলে ভাসিয়ে দিতে পারবো। কারণ আমি এখানেই মরতে চাই।

যাহোক, কোথায় আমি আর কোথায় তিনি। আজ এই শোক সন্তপ্ত দিনে সকল কিছুর উর্ধ্বে উঠে এই কীর্তিমানের প্রতি জানাই অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা। আর উচ্চারণ করবো মহত কবিতার সেই দু’টি লাইন

এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ
মরনে তাহাই তুমি করে গেছো দান।

আরও পড়ুন