শুরুটা ভালো মনে হলেও শেষটা নাটকীয়। ও. হেনরির ১৯০৭ সালের বিখ্যাত ছোটগল্প ‘দ্য র্যানসম অফ রেড চিফ’ ঠিক এই সুরেই শুরু হয়েছিল। গল্পটি মূলত এক অবাধ্য, ধূর্ত ও ভয়ংকর সত্তাকে কবজায় রাখার বিপদ নিয়ে লেখা। সেখানে দেখা যায়, দখলকারী নিজেই একসময় বন্দিতে পরিণত হয়। দুই ছিঁচকে চোর সহজে অর্থ উপার্জনের আশায় আলাবামার এক ধনী কৃষকের ১০ বছরের ছেলেকে অপহরণ করে। তাদের অনুমান ভুল ছিল। লাল চুল ও তিলযুক্ত ছেলেটি মোটেও সহজ পাত্র ছিল না। অপহরণের মুহূর্তে সে বিড়ালকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়ছিল। অপহরণকারীদের দিকেও সে ইট ছুড়ে মারে।
নিজেকে ‘রেড চিফ’ বা ‘সমতলের আতঙ্ক’ পরিচয় দেওয়া এই বালক অপহরণকারীদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে। সে অপহরণকারীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আনন্দ পেত। একপর্যায়ে সে আর নিজের বাড়িতে ফিরে যেতে চায় না। শেষমেশ অপহরণকারীরা দুই হাজার ডলার মুক্তিপণের আশা ছেড়ে দেয়। উল্টো ওই ‘অমানুষ’ বালককে ফিরিয়ে নিতে তার বাবাকে ২৫০ ডলার দিতে রাজি হয় তারা। তারপর তারা প্রাণভয়ে দৌড়ে পালায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিস্থিতি এখন অনেকটা সেই অপহরণকারীদের মতো। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অতি-আশাবাদী কথায় প্রলুব্ধ হয়ে তিনি ইরানের ওপর চড়াও হয়েছিলেন। প্রাথমিক দৃষ্টিতে তা ভালো সিদ্ধান্ত মনে হলেও এখন তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে। দুই মাস ধরে ইরানের অনড় নেতৃত্ব ও তাদের মিত্রদের মোকাবিলা করতে গিয়ে ট্রাম্প এখন দিশেহারা। তিনি বারবার দাবি করছেন মোল্লাদের তিনি পরাজিত করেছেন। তাদের সামরিক শক্তি ‘নিশ্চিহ্ন’ করার ঘোষণা দিলেও ইরান নতি স্বীকার করছে না।
ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা আগের চেয়ে নমনীয় ও আলোচনার জন্য সহজ হবে। বাস্তব চিত্র ভিন্ন। কট্টরপন্থী ও অভিজ্ঞ জেনারেলদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই সরকার আগের চেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক। ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করেনি। পারমাণবিক আলোচনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত থাকার দাবি করলেও তা কার্যত অবরুদ্ধ। এখন ইরানকে রুখতে গিয়ে ট্রাম্প নিজেই এক ধরনের আন্তর্জাতিক অবরোধের মুখে পড়েছেন।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা রিচার্ড হাস তার ‘হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে’ সংবাদপত্রে লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের ধারণার চেয়ে ইরান অনেক বেশি সহনশীল ও কৌশলী। প্রশাসনের প্রায় সব অনুমানই এখন ভুল প্রমাণিত।’ হাসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইরানের সামরিক সক্ষমতা কিছুটা কমলেও যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক বেশি সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে।
ইরান এখন ট্রাম্পকে নিয়ে বিদ্রুপ করছে। তারা ট্রাম্পের নিজের অস্ত্র অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেই তাকে নাজেহাল করছে। ইরানিরা তাকে ‘এল.ও.এস.ই.আর’ ও নেতানিয়াহুর হাতের পুতুল হিসেবে ব্যঙ্গ করছে। একটি ভাইরাল হওয়া ইরানি র্যাপ গানে বলা হয়েছে, ‘এটি তোমার না দেখা এক ফাঁদ। তোমার দর্পের সমাধিতে স্বাগতম।’ ইরানের এই ‘মিম’ যুদ্ধে পরাজয় মেনে নিয়ে ‘ডেইলি শো’-এর প্রতিনিধি রনি চিয়েং প্রশ্ন তুলেছেন, ‘যদি ট্রাম্প সাইবার বুলিং বা অনলাইনে হয়রানি করতেই ব্যর্থ হন, তবে তাকে এমন অভিযোগে অভিযুক্ত করার সার্থকতা কোথায়?’
হরমুজ প্রণালীতে ইরান শক্তি প্রদর্শন করায় ট্রাম্পকে এখন সমঝোতার টেবিলে বসতে হবে। তিনি এখন এমন এক ভূ-রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে আটকে গেছেন যেখানে একপাশে রয়েছে কট্টর রক্ষণশীল ধর্মতাত্ত্বিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা। অথচ বিশ্বের ২০ শতাংশ তেলের সরবরাহ বজায় রাখতে এই সরু জলপথ ব্যবহার করা ছাড়া গতি নেই। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন নাক গলানোর সাফল্যের পর ট্রাম্প যে আত্মবিশ্বাস পেয়েছিলেন, তা এখন ম্লান হয়ে গেছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন বিমান ভূপাতিত হওয়ার পর ট্রাম্প মেজাজ হারিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে তার সহকারীদের ওপর চিৎকার করেন। ট্রাম্পের আশঙ্কা, তার অবস্থা যেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের মতো না হয়। কার্টারের সময় জিম্মি উদ্ধার করতে গিয়ে আটটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়েছিল। সেই স্মৃতি ট্রাম্পকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
১৯৮১ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে ৫২ জন আমেরিকান জিম্মি হওয়ার ঘটনাটি আমি সাংবাদিক হিসেবে কাছ থেকে দেখেছি। জিম্মিদের পরিবারের কষ্ট ও তাদের ফিরে আসা প্রত্যক্ষ করেছি। ইরানিরা সেই সময় জিম্মিদের দরকষাকষির ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে কার্টারের ক্যারিয়ার ধ্বংস করেছিল। ট্রাম্পও এখন একই ধরনের ‘জুজুৎসু’ কৌশলের শিকার। ট্রাম্প ইস্টার উৎসবের সময় ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু ইরান মোটেও আফগানিস্তান বা ইরাকের মতো দেশ নয়। হরমুজ প্রণালীতে তারাই আসল নিয়ন্ত্রক।
ট্রাম্প তার আগের মেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের লড়াইকে ‘রক্ত ও বালির খেলা’ বলে অবজ্ঞা করতেন। সেই অবস্থান থেকে সরে এসে তিনি এখন নিজেই সেই চোরাবালিতে পা দিয়েছেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনে তিনি ইরাক যুদ্ধকে ‘বিরাট ভুল’ বলেছিলেন। এখন তিনি নেতানিয়াহুর দ্বারা প্রলুব্ধ হয়ে সেই ভুলই করছেন। জর্জ ডব্লিউ বুশ যুদ্ধের সপক্ষে কোনো রকমে একটি অজুহাত খাড়া করেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প কংগ্রেস ও মিত্রদের তোয়াক্কা না করে নেতানিয়াহুর ইশারায় পা বাড়িয়েছেন। এমনকি তার কট্টর সমর্থকরাও এতে নাখোশ।
ম্যাগি হ্যাবারম্যান ও জোনাথন সোয়ান তাদের ‘রেজিম চেঞ্জ: ইনসাইড দ্য ইম্পেরিয়াল প্রেসিডেন্সি অফ ডোনাল্ড ট্রাম্প’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, জেনারেল ড্যান কেইনের সতর্কবার্তা ট্রাম্প কানে তোলেননি। কেইন বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ালে মার্কিন সমরাস্ত্রের মজুদ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাবে। টাইমস-এর রিপোর্ট বলছে, চীনের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য তৈরি করা অত্যাধুনিক ক্রুজ মিসাইলের অর্ধেকই ইতোমধ্যে ব্যয় হয়ে গেছে।
ট্রাম্পের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা খুবই সীমিত। তিনি ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, ‘আমার হাতে সময় আছে, কিন্তু ইরানের নেই।’ বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। সময়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাম্প এখন নিজের ভাবমূর্তি রক্ষার লড়াই করছেন। ব্যবসায়ী জীবনে তিনি ‘সত্যনিষ্ঠ অতিরঞ্জন’ করার জন্য পরিচিত ছিলেন। এখন তিনি রাজনৈতিক সংকট কাটাতে অলীক কল্পনা ও অতিরঞ্জিত আশার আশ্রয় নিচ্ছেন। তার কর্মীরাও আসন্ন নির্বাচনে তেলের দাম ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কায় তটস্থ।
নিশ্চয়ই এখনকার পরিস্থিতি ট্রাম্পকে স্বস্তি দিচ্ছে না। তাই তিনি বারবার তার পরিচিত বিলাসিতার বৃত্তে বা বলরুমে ফিরে যেতে চান। ওয়াশিংটন পোস্ট-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এ বছর তিনি অসংখ্যবার তার সেই বলরুমের কথা প্রচার করেছেন। এটি সম্ভবত তার মানসিক পলায়নপরতা। ইরানের সঙ্গে যে জটিল জট তিনি পাকিয়েছেন, তা থেকে বের হওয়ার সহজ পথ তার জানা নেই।
ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি এখন এক বদ্ধ গলিতে দাঁড়িয়ে। তিনি মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়েছেন। আন্তর্জাতিক চুক্তির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছেন। ইরানের পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে আসার যে দম্ভ তিনি দেখিয়েছিলেন, তা বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে। আধুনিক সমরবিদদের মতে, শক্তি প্রদর্শন ও শক্তি প্রয়োগের মধ্যে যে সূক্ষ্ম ফারাক থাকে, ট্রাম্প তা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। ইরান এই সুযোগটিই গ্রহণ করেছে। তারা জানে ট্রাম্প সরাসরি যুদ্ধে যেতে অনিচ্ছুক, আবার সমঝোতায় ফিরতেও তার ইগোতে লাগছে। এই দোলাচলের সুযোগ নিয়ে ইরান তাদের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে।
নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে ট্রাম্প মার্কিন স্বার্থকে বিসর্জন দিচ্ছেন কি না, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করেছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটার ও যুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যে তার প্রভাব দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ইরানের সঙ্গে এই ছায়াযুদ্ধ কেবল মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করছে না, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। এর ফলে সাধারণ মার্কিন নাগরিকরা মূল্যস্ফীতির কবলে পড়ছেন।
পরিশেষে, ও. হেনরির সেই গল্পের চোরদের মতোই ট্রাম্প এখন মুক্তি খুঁজছেন। তবে এই মুক্তির পথ সহজ নয়। ইরান তাদের শর্ত না মানলে পিছু হটবে না। ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। ইরানের সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক কষ্টে থাকলেও তাদের রাষ্ট্রযন্ত্র দমে যায়নি। বরং তারা বিকল্প মিত্র খুঁজে নিয়েছে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন পারস্য উপসাগরের উত্তাল জলরাশির ওপর ঝুলছে। তিনি যদি সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারেন, তবে ইতিহাসের পাতায় তাকে আরেকজন ব্যর্থ রণকৌশলী হিসেবেই গণ্য করা হবে। রেড চিফের মতো ইরানও এখন ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এক দুর্ধর্ষ সত্তা।
*দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ এম আর লিটন।

