শনিবার

২৩শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৯ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ই-পেপার | ইংরেজি | বিশেষ সংখ্যা

জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় দ্বৈত কৌশল

আরও পড়ুন

🕙 প্রকাশিত : ১৩ মার্চ, ২০২৬ । ১০:১২ পূর্বাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের জের ধরে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ভারতের কাছ থেকে জ্বালানি তেল আমদানি বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি, রাশিয়া থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে তেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও বিশেষ অনুমতি (ওয়েভার) চেয়েছে ঢাকা। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভারতের সাম্প্রতিক সাফল্যকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ।

সম্প্রতি ভারত নিজেও রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সাময়িক ছাড় (ওয়েভার) নিয়ে তা অব্যাহত রেখেছে। এখন ঢাকাও একই পথে হাঁটতে আগ্রহী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভারত থেকে জ্বালানি সহায়তা চাইল বাংলাদেশ

মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প উৎস খুঁজছে বাংলাদেশ। এরই অংশ হিসেবে ভারতের কাছে জ্বালানি তেল সরবরাহ বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যেই ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে ১০ হাজার টন ডিজেল বাংলাদেশে পৌঁছেছে ।

বাংলাদেশ সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনির হোসেন চৌধুরী জানান, ‘আমরা এই মাসে বিপিআইএফের মাধ্যমে ১০ হাজার টন ডিজেল পেয়েছি। এপ্রিলের জন্য মজুদ তৈরির কাজ চলছে। বর্তমানে মার্চের জন্য আমাদের মজুদ যথেষ্ট। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সংকট আরও গভীর হতে পারে ।’

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী আনিন্দ্য ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, ডিজেল আমদানির এখন অনেক উৎস রয়েছে। তিনি বলেন, ‘ব্রুনাই থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টন তেল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকেও আমদানি করা যাবে। এতে আমদানি উৎসে আরও বৈচিত্র্য আসবে ।’

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মুহাম্মদ রেজানুর রহমান জানান, এই চালানটি একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অংশ, যার আওতায় ভারত বার্ষিক প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ করে থাকে ।

ভারতীয় ডিজেল আসছে ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনে

বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে ইতিমধ্যে ৫ হাজার টন ডিজেল বাংলাদেশে আসছে। বিপিসির বাণিজ্য ও কার্যক্রম বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন আজাদ গণমাধ্যমে জানান, গত সোমবার বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে পাম্পিং শুরু হয়। প্রায় ৫ হাজার টন ডিজেল আনতে প্রায় ৪৪ ঘণ্টা সময় লাগে। আমরা প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১১৩ টন তেল পাম্প করছি ।’

প্রায় ১৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি ভারতের শিলিগুড়ি মার্কেটিং টার্মিনালকে দিনাজপুরের পাড়্বতীপুর ডিপোর সঙ্গে যুক্ত করেছে। ২০২৩ সালের মার্চে এই পাইপলাইন উদ্বোধন করা হয় ।

ভারতের কাছ থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি চেয়ে চিঠি

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হতে পারে। এজন্য সরকার বিদ্যমান চুক্তির বাইরেও নতুন উৎস খুঁজছে। ভারতের কাছ থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি আমদানিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ১১ মার্চ এ সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি ভারত সরকারের কাছে পাঠানো হয় ।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ‘ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল আমদানি করা হচ্ছে। বর্তমান জরুরি পরিস্থিতিতে এই পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। কতটা বাড়ানো যাবে তা ভারতের সিদ্ধান্ত। তারা সিদ্ধান্ত নিলে বোঝা যাবে সরবরাহ কতটা বেড়েছে ।’

ভারতীয় হাইকমিশনারের ইতিবাচক সাড়া

বাংলাদেশের এই অনুরোধের বিষয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি সাংবাদিকদের জানান, ‘আপনার নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তরে বলছি, আমি বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে অতিরিক্ত সরবরাহের বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পেয়েছি। এটি আমাদের কর্তৃপক্ষের কাছে বিবেচনার জন্য পাঠাব।’

এর আগে অর্থ উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠকে আগামী চার মাসে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত ৫০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয় ।

হাইকমিশনার বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংযোগ ভারত ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আমাদের সম্পৃক্ততা এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সহযোগিতা কীভাবে আরও জোরদার করা যায় ওই বিষয়ে আলোচনা করেছি।’

দ্যা ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাইকমিশনার বলেন, ‘বাংলাদেশ ভারতের একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু এবং আমরা তার অগ্রগতির জন্য সম্ভাব্য সব সহায়তা দিতে চাই। আমরা অনুরোধটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছি।’

ভারতের অবস্থান: নিজেদের চাহিদা মিটিয়েই সহায়তা

তবে ভারত বাংলাদেশের এই অনুরোধের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের কাছ থেকে আরও পেট্রোলিয়াম সরবরাহের অনুরোধ রয়েছে। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরই এই ইস্যুটি সমাধান করা হবে ।

একজন ভারতীয় সরকারি সূত্র জানান, ভারতের নুমালীগড় রিফাইনারির উৎপাদন সক্ষমতা এবং দেশের মজুদের অবস্থা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখন ভারতের নিজস্ব বাজারে জ্বালানির প্রাপ্যতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে ।

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায়

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ঢাকা ভারতের কাছে বেশ কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে সহযোগিতা প্রত্যাশা করে। তিনি বলেন, ‘আমরা ডিজেল চাই, আমরা তাদের কাছ থেকে পানি চাই। ভারত নতুন সরকারের পর বাংলাদেশের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক গড়তে চায় বলে দাবি করে, দেখা যাক আমাদের চাহিদায় তাদের সাড়া কেমন হয় ।’

এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে , সরকার শুধু ভারত নয়, বিকল্প আরও কয়েকটি উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। এখন মজুদের কোনো ঘাটতি নেই। এই পরিকল্পনাগুলো ভবিষ্যতের চাহিদার কথা মাথায় রেখে করা হচ্ছে। যাতে জনমনে উদ্বেগের কোনো কারণ না থাকে।

মার্কিন ওয়েভার প্রার্থনা

ভারতের সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলাদেশ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও রাশিয়া থেকে তেল আমদানির জন্য বিশেষ অনুমতি (ওয়েভার) চেয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১১ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিশ্চিয়েন্সের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান। তিনি ভারতের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘ভারতকে যেমন সাময়িক ছাড় দেওয়া হয়েছে, বাংলাদেশ কেন পাবে না?’

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের মতো বাংলাদেশও নিজের জাতীয় স্বার্থে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই কৌশল গ্রহণ করেছে। তবে ভারতের অবস্থান বাংলাদেশের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। ভারত বলতে পারে, ‘আমাদের ক্রয় নীতির জন্য কোনো দেশের অনুমতি লাগে না।’ কিন্তু বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ও বৈদেশিক সম্পর্কের ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় সেভাবে বলা সম্ভব হচ্ছে না।

মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকালে ভারতের কাছ থেকে জ্বালানি সহায়তা চাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েভার প্রার্থনার মাধ্যমে বাংলাদেশ মূলত ভারতের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইছে। ভারত নিজের জাতীয় স্বার্থে রাশিয়ার তেল কিনছে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সত্ত্বেও তা অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশও এখন ওই পথে হাঁটতে চায়। ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বাংলাদেশের অনুরোধ ইতিবাচকভাবে বিবেচনার কথা বললেও , ভারতের নিজস্ব চাহিদা ও উৎপাদন সক্ষমতার ওপরই সবকিছু নির্ভর করছে ।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ