চলতি মাসের শুরুতে বিদেশে বসবাসকারী সরকারবিরোধী রুশ নাগরিকদের লক্ষ্য করে নতুন আইনে স্বাক্ষর করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। নতুন আইনে রাজনৈতিক মামলায় অনুপস্থিতিতে সাজাপ্রাপ্ত রুশ নাগরিকদের কনস্যুলার সেবা সীমিত করা হয়েছে।
এর ফলে ‘ফরেন এজেন্ট’ আইন লঙ্ঘন বা রুশ সেনাবাহিনীকে ‘অসম্মান’ করার মতো অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিরা পাসপোর্ট নবায়নসহ প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সেবা পাবেন না। এতে হাজারো রুশ নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। ইতোমধ্যে ‘ফরেন এজেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ হাজার ৬০০ ছাড়িয়েছে।
এমন সময়ে এই আইন করা হলো, যখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের বিরোধিতাকারী রুশ নাগরিকদের বসবাসের অনুমতি নবায়ন ও আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ কঠিন করছে। ফলে যুদ্ধের বিরোধিতা করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া রুশ নাগরিকরা রাশিয়া ও ইউরোপ দুই পক্ষের চাপের মুখে পড়ছেন।
আমি নিজেও এমন পরিস্থিতির শিকার
২০২২ সালের মে মাসে রাশিয়া আমার ও আমার পরিবারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়। রাজনৈতিক বিশ্বাস ও ইউক্রেন যুদ্ধের বিরোধিতার কারণে কারও নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হিসেবে এটি ছিল প্রথমদিকের পরিচিত ঘটনাগুলোর একটি।
ওই বছরের মার্চে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভে গ্রেপ্তার হওয়ার পর আমি রাশিয়া ছেড়ে পালিয়ে যাই। প্রায় এক বছর আইনি প্রক্রিয়া চলার পর আমার একমাত্র নাগরিকত্ব বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর আমার পরিবারের সদস্যদের আটক ও ভয়ভীতি দেখানো হয়। তাদের তিন দিনের মধ্যে দেশ ছাড়তে বলা হয়।
জার্মানিতে নির্বাসিত অবস্থায় আমি রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ি। একই সঙ্গে আগামী ৫০ বছর রাশিয়ায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
আমার পূর্বপুরুষদের শিকড় আর্মেনিয়ায় থাকায় আমি দেশটির নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারি। নাগরিকত্ব পেতে এক বছর সময় লাগে।
তখন রাজনৈতিক নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা রুশ নাগরিকদের জন্য মানবিক ভিসার কিছু কর্মসূচি চালু ছিল। তবে সেসব কর্মসূচিতেও সীমাবদ্ধতা ছিল। আমার ক্ষেত্রে আবেদন করতে হলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়তে হতো। বৈধ পাসপোর্ট ছাড়া সেটি সম্ভব ছিল না।
এরপর বিদেশ থেকে সরকারের বিরোধিতা করা ব্যক্তিদের শাস্তি দিতে রাশিয়া ধারাবাহিকভাবে নতুন আইন করেছে। ২০২৩ সালের নাগরিকত্ব আইনে এমন বিধান যুক্ত করা হয়, যার আওতায় বিভিন্ন ‘অপরাধে’ দণ্ডিত নাগরিকত্ব গ্রহণকারী ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব বাতিল করা যায়। এর মধ্যে রুশ সশস্ত্র বাহিনীকে ‘অসম্মান’, উগ্রবাদ ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত কর্মকাণ্ড রয়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ৪ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষের রুশ নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে খুব কম প্রতিবেদন হয়েছে।
নতুন আইন রুশ ভিন্নমতাবলম্বীদের কার্যত রাষ্ট্রহীন করার আরেকটি পথ তৈরি করেছে। লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তিরা কাগজে-কলমে রুশ নাগরিক থাকবেন। কিন্তু নাগরিকত্বের সঙ্গে যুক্ত সুরক্ষা ও সেবা থেকে কার্যত বঞ্চিত হবেন। তাদের নাগরিকত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল না হওয়ায় ১৯৬১ সালের রাষ্ট্রহীনতা হ্রাসবিষয়ক কনভেনশনের সুরক্ষাও তারা পাবেন না।
রুশ নাগরিকদের ব্যাপকভাবে নাগরিক অধিকার হারানোর ঘটনা নতুন নয়। ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের পর লাখো রুশ নাগরিক দেশ ছেড়ে পালান। তাদের অনেকের নাগরিকত্ব নবগঠিত সোভিয়েত রাষ্ট্র বাতিল করে। রুশ শরণার্থীদের ঢল সামাল দিতে ১৯২২ সালে লীগ অব নেশনস ‘নানসেন পাসপোর্ট’ চালু করে। নিজ রাষ্ট্রের কাছ থেকে ভ্রমণ নথি না পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য এটি ছিল একটি ভ্রমণ নথি।
১৯৪২ সালে নানসেন পাসপোর্ট ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের নিরাপদ আইনি মর্যাদা দেওয়ার নতুন ব্যবস্থা তৈরির বদলে বিশ্বের বিভিন্ন সরকার তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করছে।
রুশ নাগরিকদের জন্য ইউরোপেও থাকা কঠিন হয়ে উঠছে। রুশ ভিন্নমতাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য জার্মানিতে মানবিক ভিসা পাওয়ার সুযোগ এখন খুবই সীমিত। অর্থবহ সুরক্ষা পেতে হলে বিশিষ্ট অধিকারকর্মী হতে হবে অথবা ইউরোপীয় সরকারগুলোর কাছে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে হবে।
জার্মান সরকার রুশ সামরিক বাহিনী থেকে পালানো ব্যক্তিদের তৃতীয় দেশে পাঠানোও শুরু করেছে। রাশিয়ায় ফেরত গেলে তারা যে ঝুঁকিতে পড়তে পারেন, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। বহিষ্কৃতদের কেউ কারাগারে যাচ্ছেন, কেউ ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছাচ্ছেন।
ফিনল্যান্ডে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ১ হাজারের বেশি রুশ নাগরিককে বহিষ্কার করা হয়েছে। ১ হাজার ১০০টির বেশি আশ্রয় আবেদনও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বাল্টিক দেশগুলোতেও রুশ নাগরিকদের ওপর বিধিনিষেধ বাড়ছে। এর মধ্যে এস্তোনিয়ায় রুশ নাগরিকদের সম্পত্তি কেনার ওপর সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে।
ইউরোপ ছাড়া রুশ নাগরিকদের হাতে খুব বেশি বিকল্প নেই। যুক্তরাষ্ট্র গত বছরের ডিসেম্বরে আশ্রয়ের আবেদন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে। দেশটি শত শত রুশ আশ্রয়প্রার্থীকে বহিষ্কারও করেছে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলো মস্কোর অনুরোধে রুশ নাগরিকদের বহিষ্কার করছে। ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো এশিয়ার দেশগুলো তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত প্রবেশনীতি বজায় রেখেছে। তবে এসব দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ের সুযোগ নেই।
সরকারগুলো রুশ রাষ্ট্রের বিষয়ে কেন সন্দিহান, তা আমি বুঝতে পারি। নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়া, গুপ্তচরবৃত্তি ও অন্যান্য হুমকি ঠেকানোর প্রয়োজনও রয়েছে। কিন্তু নাগরিকত্বকে রাজনৈতিক আনুগত্যের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করলে সমস্যাটি আরও জটিল হয়। কর্তৃত্ববাদী সরকারের বিরোধিতাকারীরা সেই সরকার থেকে পালিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পরও শাস্তির মুখে পড়েন।
বিষয়টি আরও জরুরি হয়ে উঠছে। নতুন করে সামরিক সমাবেশের আশঙ্কায় অনেক রুশ নাগরিক আবার দেশ ছাড়ার কথা ভাবছেন। বর্তমানে রাশিয়ার যেসব পুরুষ সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বিদেশে আশ্রয় নিতে চান, তাদের জন্য নিরাপদ ও নিশ্চিত কোনো পথ নেই।
এদিকে পুতিন রুশ জনগণকে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করছেন বলে মনে হচ্ছে। গত মাসে তিনি দাবি করেন, তার সঙ্গে দেখা করা নাগরিকেরা তাকে বলেন, ‘বিশেষ সামরিক অভিযান [যুদ্ধ] শেষ হলে আমাদের করার কী থাকবে?’
রাশিয়া বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনীতি ও সমাজকে পুনর্গঠন করেছে। এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে দেশটির নেতা এখন বলছেন, মানুষ যুদ্ধ ছাড়া জীবনের কথা কল্পনাই করতে পারছে না।
যেসব রুশ নাগরিক শান্তির কথা ভাবছেন ও শান্তির জন্য কাজ করছেন, তাদের অনেকেই দেশ ছাড়ার ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পুতিনের সরকারের বিরোধিতাকারী দেশগুলোর উচিত তাদের শাস্তি না দিয়ে আশ্রয় বা অন্য কোনো বৈধ আইনি মর্যাদা পাওয়ার সুযোগ দেওয়া। নিরাপদ পরিবেশে থেকেই তারা রাশিয়ার শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের জন্য কাজ করতে পারেন।
লেখক: আর্মেনীয় বংশোদ্ভূত রুশ জলবায়ু আন্দোলনকর্মী ও রাজনৈতিক বিজ্ঞানী।




