চীন এআই নিয়ে কোনো ছাড় দিচ্ছে না। চলতি দশকের শেষ নাগাদ বিশ্বে এআই নেতৃত্ব নেওয়ার একটি পূর্ণাঙ্গ কৌশল সম্প্রতি প্রকাশ করেছে চীন সরকার। এতে বিপুল অর্থায়ন ও সম্পদ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। একদলীয় শাসনব্যবস্থার কারণে এত বড় উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা চীনের জন্য তুলনামূলক সহজ।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টি অনেক সময় অতিরঞ্জিত বক্তব্য দেয়। তবে দেশটির নেতারা এআইকে নিজেদের ক্ষমতার জন্য অস্তিত্বের হুমকি মনে করেন। এ কারণে প্রযুক্তিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় তারা সর্বশক্তি ব্যবহার করছে। এরই মধ্যে এআই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের খুব কাছে পৌঁছে গেছে চীন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এআই শিল্প নিজেদের প্রযুক্তি উন্নয়নের গতি কমানোর কথা বলছে। তাদের উদ্বেগ ভিন্ন। সিলিকন ভ্যালি এমন প্রযুক্তি তৈরি করছে, যা একসময় নির্মাতাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এমনকি এটি মানবজাতির ধ্বংস ডেকে আনতে পারে।
এআইয়ের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। প্রযুক্তিটি সত্যিই মানবজাতিকে ধ্বংস করতে পারবে কি না, তারও নিশ্চিত উত্তর নেই।
তারপরও যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এআই প্রতিযোগিতায় অনেকটা শীতল যুদ্ধের পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার মতো অবস্থানে পৌঁছেছে। পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহ হুমকিই একসময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছিল। মানবজাতিকে রক্ষায় তারা কিছু নিয়মও তৈরি করেছিল। অথচ দুই পক্ষের কাছেই বিশ্বকে বহুবার ধ্বংস করার মতো অস্ত্র ছিল।
এখন এআই নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মধ্যে সঠিক ভারসাম্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে আলোচনা চলছে। এ প্রতিযোগিতায় দুই দেশেরই আলাদা সুবিধা রয়েছে।
একই সময়ে বৈশ্বিক এআই শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ, তবে স্পষ্টভাবে নির্ধারিত নয় এমন সন্ধিক্ষণের দিকে এগোচ্ছে। এই পরিস্থিতি প্রযুক্তি নির্মাতা ও রাজনৈতিক নেতাদের এআইয়ের ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।
চীনের সক্ষমতা
এআইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক নেতৃত্ব কমে এসেছে। চীনকে আটকে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার উন্নত এআই চিপে দেশটির প্রবেশাধিকার সীমিত করেছে। এতে চীনের এআই মডেল তৈরিতে বড় বাধা তৈরি হয়।
তবে সেই বাধা কাটিয়ে উঠতে চীনা এআই কোম্পানিগুলো ভিন্ন কৌশল নেয়।
ডেটা ইন্টেলিজেন্স কোম্পানি সিনম্যাক্সের পণ্য বিভাগের প্রধান ডেভিড বেলম্যান বলেন, ‘সবচেয়ে উন্নত চিপ না থাকায় তারা আমেরিকানদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছিল না। তাই সফটওয়্যারকে আরও উন্নত ও শক্তি সাশ্রয়ী করেছে।’
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে চীনের ডিপসিক এআই মডেল বেঞ্চমার্ক পরীক্ষায় ওপেনএআইয়ের শীর্ষ মডেলের চেয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ পিছিয়ে ছিল। আগের চীনা মডেলগুলোর তুলনায় এটি ছিল বড় অগ্রগতি।
এরপর থেকে চীনা ও মার্কিন এআই মডেলগুলো প্রায় সমানে সমান। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ এআই ইনডেক্স প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশের এআই মডেলের সক্ষমতার ব্যবধান ‘কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে’।
তবে সর্বাধুনিক এআই মডেল তৈরি, বেসরকারি বিনিয়োগ ও ডেটা সেন্টার অবকাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্র এখনো এগিয়ে বলে জানিয়েছেন নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এআই আইন বিভাগের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু চিন।
তাই কোন দেশ এগিয়ে, তা নির্ভর করছে অগ্রগতি কীভাবে পরিমাপ করা হচ্ছে তার ওপর।
চীন অবশ্য কোনো ক্ষেত্রেই পিছিয়ে থাকতে চাইছে না।
২০২৫ সালে দেশটি ‘নিউ জেনারেশন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান’ প্রকাশ করে। এতে এআই নেতৃত্বে পৌঁছানোর পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
চীনের দলনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি শিল্প ও সরকারি সংস্থাগুলোকে কাজে লাগিয়ে অবকাঠামো তৈরি এবং বড় ভাষা মডেল প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে এতে।
পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য, চীনের অর্থনীতিকে দ্রুত শক্তিশালী করা। একই সঙ্গে ব্যাটারি, রোবট ও অটোমেশনসহ রূপান্তরমূলক প্রযুক্তিতে বিশ্ব নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
চীনের এই নীতি প্রকাশের পর এক শ্বেতপত্রে ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার ন্যাশনাল সিকিউরিটি ডেটা অ্যান্ড পলিসি ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা বলেন, ‘কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা চীনকে দ্রুত নিজস্ব প্রযুক্তি উন্নয়ন ও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিয়েছে।’
তবে চীনের কৌশলের দুর্বলতাও রয়েছে। ইউভিএর গবেষকদের মতে, দেশটির এআই ব্যবস্থায় রাজনৈতিক পক্ষপাতের সুযোগ রয়েছে। এর আউটপুটেও পক্ষপাত তৈরি হতে পারে।
চীনের প্রধান উদ্বেগ মানবজাতির বিলুপ্তি নয়। কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতার জন্য হুমকিই তাদের বড় ভয়।
চীনের এআই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা মূলত আদর্শিক। ব্যবহারকারীদের কাছে এআই কী তথ্য দেবে, তা নিয়ন্ত্রণ করা এবং পার্টির রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রোববার চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তামন্ত্রী চেন ইশিনের একটি নিবন্ধেও এই উদ্বেগ উঠে এসেছে। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত ‘চায়না সাইবারস্পেস’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত নিবন্ধে তিনি বলেন, এআইয়ের ওপর চীনের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হবে।
তার সতর্কতা, তা না হলে জনগণের ওপর পার্টির নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
চেনের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এআই ব্যবহার করে চীনের বিরুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা বা গোয়েন্দা সুবিধা অর্জন করতে পারে। এআই পার্টির বিরুদ্ধে প্রচারযুদ্ধেও ব্যবহার হতে পারে।
এআই নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এআই শিল্প অন্তত নিজেদের নিয়ন্ত্রণের কথা বলছে।
এআই খাতের নেতারা প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে রাজনীতিকদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব উদ্যোগকে ভুয়া দাবি ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কাছে আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, এতে চীনের কাছে বড় সুবিধা চলে যাবে।
এআই উন্নয়নের গতি কমানোর বিষয়ে শিল্পটি কতটা দৃঢ় থাকবে, তা স্পষ্ট নয়। প্রযুক্তিটি মানবজাতির জন্য কতটা ক্ষতিকর হতে পারে, শিল্পটি সেটি কতটা বিশ্বাস করে, তাও পরিষ্কার নয়।
সমালোচকেরা বলছেন, ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালানোর মতো ক্ষমতা এআইকে দিতে যে পরিমাণ কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োজন, তা অর্জনে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পকে বড় বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টার নির্মাণের গতি এআই শিল্পের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে।
শ্রমিক, নির্মাণসামগ্রী, উন্নত চিপ ও অনুমতির সংকট রয়েছে। বেড়েছে সুদের হার। ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে জনমতেও বিরোধিতা রয়েছে। এসব কারণে বড় পরিসরে নির্মাণকাজে বিলম্ব হচ্ছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গভর্ন্যান্স স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো ড্যারেল ওয়েস্ট বলেন, ‘এগুলো মৌলিক সমস্যা। এগুলো প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক মডেলকে ধ্বংস করে দিতে পারে।’
তবে বাস্তবতা হলো, এআই দিয়ে সবাইকে হত্যা করতে কতটা কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োজন, তা কেউ জানে না।
কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের অধ্যাপক ভিনসেন্ট কনিটজার বলেন, ‘কেউ যদি বলে নির্দিষ্ট একটি সক্ষমতায় পৌঁছালেই বিপর্যয় ঘটবে, তার আগে পর্যন্ত আমরা নিরাপদ, তাহলে সে মিথ্যা বলছে। কিছু বুদ্ধিদীপ্ত ধারণা যুক্ত হলে আজকের সক্ষমতাই হয়তো যথেষ্ট।’
এ কারণে এআই নিয়ন্ত্রণের পক্ষের ব্যক্তিরা মনে করেন, ধ্বংসাত্মক পর্যায়ের এআই তৈরির সম্ভাব্য সময়ের অপেক্ষা না করে এখনই নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে হবে।
অধ্যাপক চিন বলেন, ‘অবকাঠামো নির্মাণে বিলম্ব আমাদের কিছুটা সময় দিতে পারে। তবে বাড়তি সময় মানেই সুশাসন নয়।’
বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কেমন হতে পারে
অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেই চলতি সপ্তাহান্তে প্রকাশিত এক খোলা চিঠিতে বলেন, এআই সক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের ওপর নেতৃত্ব ধরে রাখতে হবে।
তবে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য যতটা দ্রুত উদ্ভাবন প্রয়োজন, যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রগতির গতি তার বেশি হওয়া উচিত নয়।
তার মতে, এতে মার্কিন এআই শিল্প প্রযুক্তিকে নিরাপদ রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাবে। একই সঙ্গে চীনের ওপর চাপ তৈরি করে দেশটিকে আলোচনার টেবিলে আনা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক এআই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে।
আমোদেই বলেন, ‘আমরা এর চেয়ে বেশি ধীর হলে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণহীন প্রকল্পগুলো এগিয়ে যাবে। এতে বড় ধরনের জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কেউ হয়তো মনে করতে পারেন, এসব পদক্ষেপ চীনের সঙ্গে সহযোগিতা কঠিন করে তুলবে। কিন্তু আমি মনে করি এর বিপরীতটাই সত্য। এসব পদক্ষেপ গণতান্ত্রিক দেশগুলোর হাতে আরও বেশি চাপ তৈরির ক্ষমতা দেবে। ভবিষ্যতে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনাও বাড়বে।’
আমোদেইয়ের প্রস্তাবে চীন আগ্রহ দেখায়নি। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ট্যাবলয়েড ‘গ্লোবাল টাইমস’-এর এক সম্পাদকীয়তে তার খোলা চিঠিকে ‘শীতল যুদ্ধের কৌশল’ বলা হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও সম্ভবত চীন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এআই নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারে এমন এআইয়ের ঝুঁকি চীনও স্বীকার করে।
প্রযুক্তিটি নির্ধারিত সীমার মধ্যে কাজ করে, তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও চীন বুঝতে পারছে।
ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার ন্যাশনাল সিকিউরিটি ডেটা অ্যান্ড পলিসি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ফিলিপ পটার বলেন, ‘এআই চীনের সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে, এ নিয়ে বেইজিংয়েরও গভীর উদ্বেগ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।’
পটারের মতে, দুই দেশের সরকার ও এআই শিল্পের জন্য সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা স্বার্থসংশ্লিষ্ট হতে পারে।
উভয় দেশের সরকার ও বেসরকারি শিল্প এমন একটি ব্যবস্থায় সম্মত হতে পারে, যেখানে বেসরকারি খাতের এআই উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ করা হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় নিরাপত্তার আওতায় এআই উন্নয়নকে আলাদা রাখা হবে।
এর বিকল্প হতে পারে নিজেদের স্বার্থে পরিচালিত একটি অস্ত্র প্রতিযোগিতা। অধ্যাপক চিনের মতে, প্রতিটি দেশ যদি কৌশলগত সুবিধা ধরে রাখাকে অপরিহার্য মনে করে, তাহলে কোনো দেশই নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নীতি অনুসরণ করতে পারবে না।
চিন বলেন, ‘কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী যেন নির্ণায়ক প্রযুক্তিগত সুবিধা অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তার বৈধ স্বার্থ রয়েছে। তবে এমন ব্যবস্থাও তৈরি না করার জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থ রয়েছে, যার আচরণ, লক্ষ্য বা পরবর্তী প্রভাব আমরা নির্ভরযোগ্যভাবে বুঝতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।’





