কলকাতায় আশঙ্কাজনকভাবে কমছে জন্মহার

আরও পড়ুন

🕙 প্রকাশিত : ২১ এপ্রিল, ২০২৬ । ৫:৪৯ পিএম

‘বার্ধক্যে বারাণসী’ প্রবাদটি এতদিন পরিচিত ছিল। সময়ের পরিবর্তনে এখন হয়তো বলতে হবে, বার্ধক্যে কলকাতা। কলকাতায় জন্মহার আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। প্রজনন হার এখন ১-এর নিচে। পৃথিবীর খুব কম শহরেই এ সংখ্যা এত কম। জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে এ হার অন্তত ২ দশমিক ১ থাকা প্রয়োজন। কলকাতায় তা অর্ধেকের কম। অর্থাৎ শহরে প্রবীণদের সংখ্যা বাড়ছে আর যুবকের সংখ্যা কমছে।

এর পরিণাম ভয়াবহ হতে পারে। ভবিষ্যতে কোনো বড় শিল্পগোষ্ঠী কলকাতায় কারখানা গড়তে চাইলে কর্মীসংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তখন নিত্যপণ্যের মতো কর্মীও প্রতিবেশী রাজ্য থেকে আনতে হবে। ভারত সরকারের গত বছরের তথ্যে এ উদ্বেগের চিত্র ফুটে উঠলেও এ নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের উচ্চ জনঘনত্বের কারণে অনেকে মনে করছেন, জনসংখ্যা কমলে শহরের লাভ হবে। এ যুক্তি আসলে ভ্রান্ত। শুরুতে কিছুটা লাভ হলেও ভবিষ্যতে ব্যবসা ও শিল্পে শ্রমিকের অভাব ঘটবে। কর্মক্ষম মানুষের তুলনায় বয়স্কদের সংখ্যা বাড়লে পেনশন ও স্বাস্থ্য পরিষেবার বোঝা বাড়বে।

শহরের নীতিনির্ধারকদের এ নিয়ে হুঁশ নেই। বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে নানা পক্ষে লড়াই চললেও জন্মহার হ্রাস নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো বক্তব্য নেই। বড় রাজনৈতিক দলের নেতারা এ নিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমতি ছাড়া মুখ খুলতে নারাজ। এই নীরবতায় বিস্মিত জনসংখ্যা গবেষকরা। ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ কলকাতার অধ্যাপক শাশ্বত ঘোষ জানান, বিষয়টি নিয়ে কোনো স্তরেই আলাপ-আলোচনা নেই। তার মতে, সত্তরের দশকের শুরুতেই কলকাতার প্রজনন হার ২ দশমিক ১-এর নিচে নেমেছিল। বর্তমানে তা শূন্য দশমিক ৮-এ পৌঁছেছে, যা প্রায় সর্বনিম্ন স্তর।

কলকাতাকে এ দেশে ছোট পরিবারের সংস্কৃতির আদিস্থল বলা যায়। পরিবারে এক বা দুটি সন্তান থাকা পাঁচ-ছয় দশক আগেই এখানে স্বাভাবিক ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে কলকাতা ও শহুরে বাংলায় দ্বৈত আয়ের সন্তানহীন দম্পতির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। গবেষকদের মতে, উচ্চ নারীশিক্ষা, দেরিতে বিয়ে ও পেশাজীবনের প্রতি অধিক মনোযোগ এর বড় কারণ।

বিগত এক দশকের প্রবণতা বলছে, কলকাতার অনেক পেশাজীবী দম্পতি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও ভ্রমণকে অগ্রাধিকার দিয়ে সচেতনভাবে সন্তানহীন থাকছেন। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ ও আর্থিক অনিশ্চয়তাও এর পেছনে দায়ী। কলকাতায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম হওয়ায় সন্তান লালন-পালনকে অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন। বিশেষ করে শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধি অনেককে পরিবার ছোট রাখতে উৎসাহিত করছে।

মানিকতলার বাসিন্দা অনন্যা দাশগুপ্ত জানান, সঞ্চয় ও চাকরির নিরাপত্তা না থাকায় সন্তান নেওয়া তার কাছে বড় চাপের ব্যাপার। তার সমবয়সী অনেক বন্ধু ও আত্মীয় একইভাবে নিঃসন্তান থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে সামাজিক ও পারিবারিক চাপ এখনো কমেনি। কসবার স্কুলশিক্ষিকা অহনা বিশ্বাসের মা তাকে নিয়মিত সন্তান নেওয়ার কথা মনে করিয়ে দেন। অহনা মনে করেন, ভবিষ্যতে নিজেদের সামলাতে অসুবিধা হলে তিনি সহায়কের সাহায্য নেবেন অথবা বৃদ্ধাশ্রমে চলে যাবেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের প্রজনন হার জাতীয় হারের মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ। গোটা দেশে শহরাঞ্চলের গড় ১ দশমিক ৫ হলেও পশ্চিমবঙ্গে তা ১ দশমিক ১। গ্রামাঞ্চলেও জাতীয় গড়ের তুলনায় বাংলার হার অনেক কম। এর ফলে ভারতে বাঙালির আনুপাতিক সংখ্যা কমবে। উদ্বেগের বিষয় হলো, বেশি বয়সে সন্তান নিতে গিয়ে অনেকে শারীরিক জটিলতায় পড়ছেন। ফলে শহরে ফার্টিলিটি ক্লিনিকের সংখ্যা বাড়ছে।

বিশ্বের অনেক শিল্পোন্নত দেশে জন্মহার বাড়াতে দম্পতিদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে সন্তান পালনের জন্য নগদ অর্থ, দীর্ঘ ছুটি ও কর ছাড়ের সুবিধা দেওয়া হয়। চীনের কোনো কোনো প্রদেশে নির্দিষ্ট বয়সের আগে মা হলে এককালীন অনুদান দেওয়া হয়। জাপান ও সিঙ্গাপুরেও শিশুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিপুল ভর্তুকি এবং বিশেষ ছুটির ব্যবস্থা রয়েছে। ভারতে অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু জন্মহার বাড়াতে এককালীন অর্থ ও নিখরচায় শিক্ষার মতো প্রকল্প ঘোষণা করেছেন।

পশ্চিমবঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প থাকলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সংকট মোকাবিলায় কোনো উদ্যোগ নেই। ভবিষ্যতে জনশক্তি না থাকলে বর্তমানের সুবিধাগুলো ভোগ করার মতো মানুষ থাকবে না। রাজনৈতিক দলগুলো এখন নির্বিকার থাকলেও অদূর ভবিষ্যতে হয়তো জন্মহার বৃদ্ধির জন্য নতুন কোনো পরিকল্পনার কথা ভাবতে হবে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ