বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য এখন যুদ্ধের চেয়েও বড় আতঙ্ক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। সম্প্রতি ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ও শীর্ষ আর্থিক বিশেষজ্ঞরা এতে অংশ নেন। বৈঠকে ‘মিথোস’ নামে এক এআই মডেল বিশ্বনেতাদের আলোচনায় এসেছে। এই প্রযুক্তি নিয়ে এখন চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি বিশ্বের সমগ্র আর্থিক ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। এই প্রযুক্তি ভুল হাতে পড়লে ব্যাংকিং ব্যবস্থার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ডিভাইস যেমন মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট বা কম্পিউটারও চরম অনিরাপদ হয়ে পড়তে পারে।
আইএমএফপ্রধান থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি পর্যন্ত সবাই এখন এই এক গভীর উদ্বেগের অংশীদার।
বিবিসির যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী সিবিএস নিউজের তথ্যমতে, মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেস্যান্ট ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিউইয়র্কের আর্থিক কেন্দ্র ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন। আইএমএফপ্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিভাও এই উদ্বেগের কথা স্বীকার করেছেন। সাইবার নিরাপত্তা হুমকি কেন বাড়ছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ! আমরা এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন।’
বার্কলেস ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী সিএস ভেঙ্কটাকৃষ্ণানের মতে, বিশ্বজুড়ে জ্বালানিসংকট বা যুদ্ধবিগ্রহের চেয়েও বড় ভয় হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। অন্যদিকে কানাডার অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেন মনে করেন, হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক অবস্থান ও হুমকি আমাদের চেনা হলেও মিথোসের মতো অদৃশ্য হুমকির গভীরতা এখনও অজানা।
মিথোস হলো আমেরিকান প্রযুক্তি সংস্থা ‘অ্যানথ্রোপিক’-এর তৈরি একটি শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল। এটি সাধারণ কোনো এআই নয়। কোম্পানিটির একটি বিশেষ পরীক্ষক দল বা ‘রেড টিম’ এই সিস্টেমটি পরীক্ষা করে দেখেছে। তাদের মতে, মিথোসের কম্পিউটার কোডের ভেতর লুকিয়ে থাকা সূক্ষ্ম ত্রুটি খুঁজে বের করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা রয়েছে। এটি যেকোনো সফটওয়্যারের এমন সব দুর্বলতা শনাক্ত করতে পারে, যেগুলো সম্পর্কে স্বয়ং নির্মাতা কোম্পানিও অবগত নয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই মডেলটিকে এমন কাজের জন্য আলাদাভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। এটি নিজে থেকেই এই সক্ষমতা অর্জন করেছে। অ্যানথ্রোপিক একে বর্ণনা করেছে একটি অভাবনীয় কারিগরি দক্ষতা হিসেবে। তবে এই দক্ষতাই এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ ভুল হাতে পড়লে এটি পৃথিবীর যেকোনো সুরক্ষিত সিস্টেমে অনায়াসে অনুপ্রবেশ করতে পারবে।
অ্যানথ্রোপিকের বিবৃতি অনুযায়ী, মিথোস মূলত সফটওয়্যার কোডের ‘জিরো ডে’ ত্রুটি খুঁজে বের করতে দক্ষ। জিরো ডে বলতে সেই সব কারিগরি ছিদ্র বোঝায়, যা এখনো মানুষের নজরে আসেনি এবং কোনো সমাধান তৈরি হয়নি। কোম্পানিটি দাবি করেছে, মিথোস বর্তমান বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রধান অপারেটিং সিস্টেম ও ওয়েব ব্রাউজারের ত্রুটি খুঁজে পেতে সক্ষম। এমনকি এটি ১০ বা ২০ বছর পুরোনো এমন সব সূক্ষ্ম দুর্বলতাও শনাক্ত করেছে, যা বিগত দুই দশকে কোনো সফটওয়্যার ডেভেলপার ধরতে পারেননি।
উদাহরণ হিসেবে ‘ওপেনবিডিএস’ অপারেটিং সিস্টেমের কথা বলা যায়। এটি নিরাপত্তার জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। অথচ মিথোস সেখানে এমন একটি ত্রুটি খুঁজে পেয়েছে, যা দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে বিদ্যমান ছিল। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ গর্ডন এম গোল্ডস্টেইন বলেন, ‘এই মডেলটি প্রথমে একটি জিরো ডে দুর্বলতা শনাক্ত করে। তারপর সেই দুর্বলতাকে অন্য ত্রুটির সঙ্গে মিলিয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে সিস্টেমে টিকে থাকে।’ এভাবে মিথোস একটি পুরো সিস্টেমের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।
মিথোসের এই সক্ষমতা কেবল ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি। গোল্ডস্টেইনের মতে, বাঁধ, পারমাণবিক চুল্লি, বিদ্যুৎ ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার মতো খাতগুলো এখনো পুরোনো সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল। এআই বিশেষজ্ঞ ড্যান হেন্ড্রিক্স মনে করেন, মিথোসের মতো মডেলগুলো এই ব্যবস্থাগুলোকে অনেক বেশি অসুরক্ষিত করে তোলে। অরাষ্ট্রীয় কোনো পক্ষ বা হ্যাকার গোষ্ঠী এই প্রযুক্তির মাধ্যমে জাতীয় অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানালে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ।
অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছে, মিথোস একটি ওয়েব ব্রাউজারে চারটি দুর্বলতা শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফায়ারওয়াল বাইপাস করতে পেরেছে। একইভাবে এটি বিভিন্ন সার্ভারে প্রবেশের জন্য নিজস্ব আক্রমণ পদ্ধতি বা অ্যাটাক ভেক্টর তৈরি করে নেয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মোবাইল ফোনে ব্যবহৃত অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমও লিঙ্কের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ফলে সাধারণ মানুষের স্মার্টফোনগুলোও এখন এই হুমকির মুখে। হ্যাকিংয়ের জন্য আগে গভীর কারিগরি জ্ঞানের প্রয়োজন হতো। এখন এআই নিজেই সেই কাজটি করে দিচ্ছে। ব্যবহারকারীকে শুধু নির্দেশ দিতে হয়। লাহোরভিত্তিক আইটি বিশেষজ্ঞ সুফিয়ান এলাহী বলেন, ‘যদি মিথোস হ্যাকারদের হাতে পড়ে, তবে তারা ব্যাংক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজে নিশানা করতে পারবে।’
যদিও অ্যানথ্রোপিক এখন মিথোসের ব্যবহার সীমিত রেখেছে। এটি শুধু অ্যামাজন, অ্যাপল ও এনভিডিয়ার মতো বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শেয়ার করেছে। উদ্দেশ্য হলো, হ্যাকাররা এটি পাওয়ার আগেই বড় কোম্পানিগুলো যেন নিজেদের সিস্টেমের ত্রুটিগুলো সারিয়ে নিতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে প্রযুক্তি একবার উদ্ভাবিত হলে তা গোপন রাখা কঠিন। কোনোভাবে এটি ফাঁস হয়ে গেলে জননিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধসে পড়তে পারে।
প্রশ্ন উঠেছে, মিথোস কি তার নির্মাতাদের তৈরি করা নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারবে? অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, কোনো এআই মডেল তাকে দেওয়া সরঞ্জামের বাইরে কাজ করতে পারে না। তবে প্রযুক্তি দুনিয়ায় কোনো কিছুই শতভাগ নিশ্চিত নয়। ইসলামাবাদভিত্তিক এক ডেটা সায়েন্স বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ঝুঁকি হলো এটি বড় কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ফাঁস হয়ে যাওয়ার। পৃথিবীতে এমন আরও মডেল হয়তো ইতোমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে, যা আমাদের ধারণার বাইরে।’


