ট্রাম্পের রাশিয়ামুখী নীতি, চাপে ইউক্রেন
গোয়েন্দা সহায়তা বন্ধের হুমকি, রুশ জ্বালানিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও ডিজেল চুক্তি ঘিরে ওয়াশিংটন-কিয়েভ সম্পর্কে গভীর ফাটল; যুদ্ধের ময়দানে বাড়ছে ইউক্রেনের ঝুঁকি।
রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলায় জ্বালানির দাম বাড়ায় ক্ষুব্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সমালোচনা করেছেন। মার্কিন সরবরাহ করা স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যাহত হওয়ায় ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে। শীতের আগে জ্বালানি অবকাঠামোয় রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতির সময় এমন পরিস্থিতি কিয়েভকে আরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
ট্রাম্পের সমালোচনার জবাবে জেলেনস্কি প্রকাশ্যে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার প্রতি পক্ষপাত দেখাচ্ছে। রাশিয়ার অব্যাহত হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, রুশ জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধে ট্রাম্পের দাবি ইউক্রেন মানবে না।
শুক্রবার কার্যকর হওয়ার কথা থাকা গুরুত্বপূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কে নির্ধারিত সময়ের ঠিক আগে ছাড় দেন ট্রাম্প। এতে দুই দেশের বিরোধ আরও বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেলেনস্কি বলেন, ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত রাশিয়াকে ইউক্রেনে হামলা চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করবে।
ক্রমবর্ধমান বিরোধে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, ট্রাম্প ও জেলেনস্কির অস্থির সম্পর্ক ইউক্রেনের জন্য আরও বড় সংকট ডেকে আনতে পারে। ট্রাম্প ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহ কমাতে পারেন, যুদ্ধক্ষেত্রের গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করতে পারেন কিংবা মস্কোর সঙ্গে আরও অর্থনৈতিক চুক্তি করতে পারেন।
আলোচনা সম্পর্কে অবগত দুই ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, জেলেনস্কির কঠোর মন্তব্যের পরও কিয়েভ ট্রাম্পের দূত ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যেতে চায়।
ওয়াশিংটনে ইউক্রেন দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ডেনিস সিয়েনিক শুক্রবার নিউজম্যাক্সকে বলেন, যুদ্ধ অবসানের প্রচেষ্টায় ট্রাম্প ও তাঁর দলের প্রতি ইউক্রেন কৃতজ্ঞ। রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসতেও প্রস্তুত কিয়েভ।
শুক্রবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, জেলেনস্কি ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন—দুজনের সঙ্গেই তিনি আলোচনা চালিয়ে যাবেন। তিনি বলেন, ‘আমি চাই ওই যুদ্ধের অবসান হোক।’
‘হাতছাড়া সুযোগ’: সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা
২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ইউরোপবিষয়ক মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ড্যানিয়েল ফ্রিড বলেছেন, ওয়াশিংটন ইউক্রেনের কাছ থেকে স্থায়ীভাবে সরে আসছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনে শুরু হওয়া যুদ্ধ অবসানের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক আটলান্টিক কাউন্সিলের কর্মকর্তা ফ্রিড বলেন, ‘এটি একটি হাতছাড়া সুযোগ। এর ফলে ইউক্রেনের মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে, পুতিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে উৎসাহিত হচ্ছেন। এর কোনো ইতিবাচক ফল নেই।’
জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই অস্বস্তিকর। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে এক বৈঠকে ট্রাম্প ও মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রকাশ্যে জেলেনস্কিকে তিরস্কার করেন।
ট্রাম্পের আমলে ওয়াশিংটন ইউক্রেনের সামরিক সহায়তা স্থগিত করেছে কিংবা সরবরাহ কমিয়েছে। তবে ইউরোপীয় মিত্রদের কিয়েভের জন্য মার্কিন অস্ত্র কেনার অনুমতি দিয়েছে।
এ বছর রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলার পর জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করলে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন দেখা দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে পেট্রোল ও ডিজেলের উচ্চমূল্য ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। নির্বাচনে তাঁর রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ। এ সংঘাতের জেরে জ্বালানি স্থাপনায় ইরানের হামলা হয়েছে, পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অনেকাংশে বন্ধ হয়ে গেছে।
তবে অভ্যন্তরীণ আলোচনা সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, জেলেনস্কির ওপর হতাশ হয়ে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো ও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ট্রাম্প রাশিয়ার দিকে ঝুঁকেছেন।
৯ অক্টোবর ট্রাম্প জানান, রুশ জ্বালানির ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নেওয়া এবং রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির বিষয়ে পুতিনের সঙ্গে তাঁর সমঝোতা হয়েছে।
শুক্রবার হোয়াইট হাউসের জারি করা এক নির্বাহী আদেশে রাশিয়া-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কে ছাড় দেন ট্রাম্প। গত মাসে স্বাক্ষরিত গ্রাহাম অ্যাক্ট কার্যকর হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রয়াত মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে নামকরণ করা আইনটিতে আগামী সপ্তাহ থেকে রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান রয়েছে। তবে মার্কিন জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন হলে প্রেসিডেন্ট এসব নিষেধাজ্ঞা মওকুফ করতে পারবেন।
জেলেনস্কির মতে, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রাহাম অ্যাক্টের মূল উদ্দেশ্য দুর্বল করেছে। এতে রাশিয়ার ‘মানুষ হত্যা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা’ আরও বাড়বে।
রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল চুক্তি ও নিষেধাজ্ঞায় ছাড় মস্কোর ওপর চাপ কমানোর সর্বশেষ পদক্ষেপ। জেলেনস্কি আশঙ্কা করছেন, এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, জুলাইয়ে গ্রাহামের মৃত্যুর পর যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার ওপর চাপ বজায় রাখার মার্কিন সম্ভাবনা কমেছে। সাউথ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সিনেটর গ্রাহাম ছিলেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তিনি ইউক্রেনের প্রতি জোরালো সমর্থন জানিয়ে আসছিলেন।
জেলেনস্কি লেখেন, ‘সত্যি বলতে, তাঁকে ছাড়া পরিস্থিতি খুব কঠিন।’
ইউক্রেনের জন্য বড় ঝুঁকি
কিয়েভের জন্য পরিস্থিতির পরিণতি গুরুতর ও তাৎক্ষণিক হতে পারে। মঙ্গলবার জেলেনস্কি বলেন, রাজধানীতে রাশিয়ার প্রাণঘাতী হামলার আগে পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে কোনো সতর্কবার্তা পায়নি ইউক্রেন।
মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য না পেলে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শনাক্ত এবং প্রতিহত করা ইউক্রেনের জন্য আরও কঠিন হবে। বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষায় সমস্যা বাড়তে পারে। গত কয়েকটি শীতে রাশিয়া বারবার এসব স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইউক্রেনের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করছে। তবে জেলেনস্কি এনপিআরকে বলেন, মার্কিন কর্মকর্তারা ইউক্রেনের সামরিক কমান্ডারদের সতর্ক করেছেন, গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া কিংবা পুরোপুরি বন্ধ করা হতে পারে।
বৃহস্পতিবার রয়টার্স জানায়, স্পেসএক্সের সামরিক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবস্থা স্টারশিল্ড ইউক্রেনে ব্যাহত হয়েছে। এ বিষয়ে অবগত দুই মার্কিন কর্মকর্তা ও এক পশ্চিমা কর্মকর্তার মতে, হোয়াইট হাউসের নির্দেশের পর এ ঘটনা ঘটে।
পরিষেবাটি আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। তবে এ ঘটনা দেখিয়েছে, মার্কিন প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রযুক্তির ওপর ইউক্রেনের নির্ভরতা দেশটিকে কতটা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে এসব পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে রাশিয়ার সুবিধার্থে ইউক্রেনকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখলে কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যদের বিরোধিতার মুখে পড়তে পারেন তিনি। তাঁর দলের অনেক সদস্য এখনও ইউক্রেনকে সমর্থন করেন। তাঁদের কেউ কেউ মনে করেন, মস্কোর অনুকূল শর্তে সমঝোতা মেনে নিতে কিয়েভের ওপর ওয়াশিংটনের চাপ দেওয়া উচিত নয়।
ট্রাম্পের প্রতি জেলেনস্কির কঠোর অবস্থান ঝুঁকিপূর্ণ হলেও তিনি হয়তো মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলের ওপর ভরসা করছেন। এতে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং ইউক্রেনের সামরিক সহায়তা কমানো ট্রাম্পের জন্য কঠিন হতে পারে।
এমনটাই বলেছেন ওবামা প্রশাসনের সাবেক পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল সিচুয়েশন রুমের প্রধান ব্রেট ব্রুয়েন।
তিনি বলেন, ‘জেলেনস্কি জানেন, তিনি কার সঙ্গে কথা বলছেন। জেডি ভ্যান্স যখন ওভাল অফিসে তাঁকে অপমান করার চেষ্টা করেছিলেন, তখন ট্রাম্পের হুমকির যে প্রভাব ছিল, এখন আর তা নেই।’




