যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থার মধ্যে ইরানের মানুষের জীবন এক জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তেহরানের মতো বড় শহরগুলোতে দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার আভাস দিচ্ছে। বাজারঘাট খোলা, যানবাহন চলছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ ইরানিদের অভিজ্ঞতার বয়ান ভিন্ন। সেখানে উঠে আসছে তীব্র মানসিক ক্লান্তি, অর্থনৈতিক টানাপড়েন ও ইন্টারনেটে অসম প্রবেশাধিকারের এক ধূসর চিত্র। কয়েকজনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় পুরো সমাজের চিত্র প্রতিফলিত না হলেও সাম্প্রতিক সময়ের সংকটগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ একদিকে যেমন জীবনকে সচল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে ইন্টারনেটে বিধিনিষেধ ও অনিশ্চয়তা দেখিয়ে দিচ্ছে আসলে যুদ্ধে জীবন যেমন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যাপিত জীবন নিয়ে ইরানিদের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন দেখা গেছে। একদল মানুষ সংকটের সময়েও স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকারের পক্ষে সওয়াল করছেন। অন্যদিকে কেউ কেউ একে পরিস্থিতির প্রতি উদাসীনতা বলে মনে করেন। ক্যাফেতে যাওয়া বা নতুন পোশাক কেনার মতো সাধারণ বিষয় নিয়েও বিতর্ক চলছে। একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমি গত রাত থেকে অনেকবার কেঁদেছি। তা সত্ত্বেও বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার সময় সুন্দর পোশাক পরে সেজেছি। মন খারাপ থাকলেও এই স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা নিয়ে কারও নেতিবাচক মন্তব্য করা ঠিক নয়।’
যুদ্ধের আতঙ্ক ভুলে থাকতে অনেকেই এখন ঘরোয়া কাজে বা খেলাধুলায় মন দিচ্ছেন। জনৈক ফুটবল ভক্তের মতে, মানসিক চাপের মধ্যে মনের কিছুটা বিনোদন প্রয়োজন। তাই এই সংকটেও যারা খেলাধুলা নিয়ে মেতে আছেন, তাদের নেতিবাচকভাবে দেখা ঠিক নয়। মানুষের ভাষ্য হলো, এই পরিস্থিতি হয়তো দীর্ঘস্থায়ী হবে। তাই মানসিকভাবে শক্ত থাকতে নিজেকে ব্যস্ত রাখা জরুরি।
ইরানের বর্তমান পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট সংযোগ একটি মৌলিক অধিকারের চেয়ে বেশি কিছু হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে কম বিধিনিষেধযুক্ত বিশেষ ইন্টারনেট সুবিধা দিচ্ছে। এটি স্থানীয়ভাবে ‘ইন্টারনেট প্রো’ বা ‘সাদা সিম’ নামে পরিচিত। ব্যবসায়ী বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে এই উন্নত সেবা পাচ্ছেন। সাধারণ ব্যবহারকারীরা একে ‘শ্রেণিভিত্তিক ইন্টারনেট’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
একজন ব্যবহারকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘ইন্টারনেট প্রো মানে একটি জনস্বার্থকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা। এটি সামাজিক বিভাজন আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।’ সাধারণ মানুষের জন্য ইন্টারনেট অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সীমিত। এক জিবি ইন্টারনেট স্পেসের জন্য ১০ লাখ রিয়াল খরচ করার কথা জানিয়েছেন এক নাগরিক। তার আক্ষেপ, ‘সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকি, ডেটা ফুরিয়ে গেলে আবার অন্ধকারে পড়ে যাব।’ জনগণের দাবি, ‘উন্মুক্ত ইন্টারনেট সবার অধিকার। এই অধিকারের জন্য ভিক্ষা করতে হবে কেন?’
যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানের অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে এসেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসা ও ইন্টারনেটনির্ভর কাজগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি ক্যাফে মালিকের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে একজন লিখেছেন, ‘দোকানটি মোমবাতির মতো গলে যাচ্ছে। শুধু এক সুতোয় ঝুলে আছে।’ বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পারায় অনেকের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে। শিল্পখাতেও আঘাত এসেছে। ইস্পাত ও পেট্রোকেমিক্যাল কারখানায় হামলার প্রভাবে বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, তার পুরো পরিবার এখন বেকার হয়ে ঘরে বসে আছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম। রুটি, পনির, ওষুধ ও ডিমের মতো পণ্যের আকাশচুম্বী মূল্যের তালিকা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরছে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে আসায় জন-অসন্তোষ তীব্র হচ্ছে।
শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর যুদ্ধের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হচ্ছে। অনেকের মধ্যেই উদ্বেগের কারণে শরীর কাঁপার মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা মানুষের কানে এক ধরনের বিভ্রম তৈরি করেছে। আকাশ থেকে পড়া বজ্রপাতের শব্দকেও অনেকে বোমা বিস্ফোরণ বলে ভুল করছেন। একজন লিখেছেন, ‘মানসিক চাপের কারণে সারা শরীর কাঁপছে। সাধারণ কোনো শব্দ শুনলেই মনে হয় যুদ্ধবিমান বা বিস্ফোরণ।’
আগামীকাল কী হবে, ওই অনিশ্চয়তা ইরানিদের তাড়া করে ফিরছে। ‘হয়তো কালই আবার যুদ্ধ শুরু হবে’–এমন আতঙ্ক গ্রাস করেছে সাধারণ নারীদেরও। ওই মানসিক ট্রমা থেকে সেরে ওঠার সুযোগ পাচ্ছেন না কেউ। যুদ্ধের সরাসরি প্রভাবের চেয়েও যুদ্ধের আশঙ্কার অনিশ্চিত সময়টি মানুষকে বেশি ক্লান্ত করে তুলছে। ইরানের এই খণ্ড খণ্ড চিত্রগুলো একটি বৃহত্তর সংকটের দিকে নির্দেশ করে। একদিকে অর্থনৈতিক ক্ষতি, অন্যদিকে সামাজিক ও শ্রেণিগত ব্যবধান বেড়ে চলা। ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ থেকে শুরু করে জীবনযাপনের মান সব ক্ষেত্রেই একটি বৈষম্য তৈরি হয়েছে। নাগরিকরা প্রশ্ন তুলছেন, ‘এই পরিস্থিতি থেকে আদতে কী অর্জন হচ্ছে?’
সীমিত সুযোগের মধ্যে বেঁচে থাকার সংগ্রাম, অর্থনৈতিক চাপ ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা এখন ইরানের মানুষের নিত্যসঙ্গী। সবকিছুর মাঝেও জীবন থেমে নেই। ক্লান্তি ও বৈষম্যবোধ নিয়েই ইরানিরা সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছেন। এই বার্তাগুলো কেবল বর্তমানের কষ্ট নয়। এটি প্রজন্মের দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের গল্প বলছে। ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের ছায়া কতদিন বজায় থাকবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও সংশয় দুই-ই বিদ্যমান।


