পর্যাপ্ত খাবার ও পানি ছাড়া মাসের পর মাস যুদ্ধক্ষেত্রে একদল কঙ্কালসার সৈন্যকে ফেলে রাখার ঘটনায় ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক শীর্ষ কমান্ডারকে বরখাস্ত করেছে। সৈন্যদের একজনের স্ত্রী আনাসতাসিয়া সিলচুক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিগুলো পোস্ট করলে এই কেলেঙ্কারি সামনে আসে। ছবিতে চারজন সেনাকে অত্যন্ত অপুষ্টিতে ভোগা ও ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল। তাদের পাঁজরের হাড় বেরিয়ে এসেছিল এবং বাহুগুলো ছিল সরু।
স্বজনরা জানান, উত্তর-পূর্ব ইউক্রেনের কুপিয়ানস্ক শহরের কাছে ওস্কিল নদীর বাম তীরে একখণ্ড ভূখণ্ডে আট মাস ধরে মোতায়েন ছিলেন এই সৈন্যরা। সেখানে রসদ ও ওষুধের জোগান কেবল ড্রোনের মাধ্যমে পাঠানো সম্ভব ছিল। আনাসতাসিয়া সিলচুক পোস্টে লেখেন, ‘ছেলেরা যখন যুদ্ধক্ষেত্রে এসেছিল, তখন তাদের ওজন ছিল ৮০ থেকে ৯০ কেজির বেশি। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ কেজিতে।’ তিনি জানান, একবার খাবার আসার পর টানা ১০ দিন কোনো সরবরাহ পৌঁছাত না। তৃষ্ণা মেটাতে সৈন্যরা বৃষ্টির পানি পান করতেন ও বরফ গলাতেন।
সিলচুক আরও জানান, ‘খাবার ছাড়া তারা সর্বোচ্চ ১৭ দিন কাটিয়েছেন। রেডিওতে তাদের আকুতি শোনা হতো না বা কেউ শুনতে চাইত না। আমার স্বামী চিৎকার করে অনুনয় করতেন যে কোনো খাবার ও পানি নেই।’ তিনি মনে করেন, এই সংকট কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আরেক স্বজন ইভানা পোবেরেঝনিউক জানান, ১৪তম স্বতন্ত্র যান্ত্রিক ব্রিগেডের সৈন্যরা ভয়ংকর পরিস্থিতির শিকার। ক্ষুধায় যোদ্ধারা জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। তার বাবাকে ওই অবস্থান থেকে সরানো হলেও অন্যরা এখনও সেখানে আটকা পড়ে আছেন।
ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফ জানিয়েছে, সৈন্যদের খাবার সরবরাহের দায়িত্বে থাকা কমান্ডারকে বদলি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্রিগেড রসদ সরবরাহের সমস্যার কথা স্বীকার করে জানায়, শত্রুসেনার অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থানের কারণে কেবল আকাশপথেই সরবরাহ সম্ভব ছিল। ব্রিগেডের এক মুখপাত্র বলেন, ‘সবকিছুই ড্রোনের মাধ্যমে করা হয়। রুশরা খাবার, গোলাবারুদ ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর কড়া নজর রাখে। তারা ড্রোনগুলো লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে ভূপাতিত করে। অনেক সময় তারা আমাদের সামরিক সরঞ্জামের চেয়ে রসদ সরবরাহে বেশি বাধা দেয়।’
২০২২ সালের শুরুতে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের পর দুই পক্ষের মধ্যকার ‘ধূসর অঞ্চল’ ব্যাপক প্রসারিত হয়েছে। উভয় পক্ষই নজরদারি এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ব্যাপকভাবে ড্রোন ব্যবহার করছে। সৈন্যরা তাদের অগ্রবর্তী অবস্থানে পৌঁছাতে ১০-১৫ কিলোমিটার হেঁটে যেতে বাধ্য হন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেন রসদ পাঠাতে এবং আহতদের সরিয়ে নিতে চালকবিহীন স্থল রোবটের ব্যবহার বাড়িয়েছে। কুপিয়ানস্ক সেক্টরে ওস্কিল নদীর ওপরের সেতুগুলো ধ্বংস করে রুশ বাহিনী ইউক্রেনীয় সেনাদের বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে।
শুক্রবার সিলচুক জানান, বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তিনি লেখেন, ‘নতুন একজন কমান্ডার এসেছেন। তিনি আমাদের ফোন করে জানিয়েছেন পরিস্থিতির সমাধান হচ্ছে। আমার স্বামীও লিখেছেন যে তিনি গত আট মাসের মধ্যে এই প্রথম পেটভরে খেয়েছেন।’ সিলচুক আরও যোগ করেন, ‘ছেলেরা এখন অল্প অল্প করে খাচ্ছে। তাদের পেট ছোট হয়ে গেছে। তারা জানে না আগামীকাল খাবার পাবে কি না। পরিস্থিতিটি জনসমক্ষে তোলা প্রয়োজন ছিল। এখন ছেলেদের সুচিকিৎসা দরকার।’ ইউক্রেনের সামরিক কমান্ড ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। তারা জানায়, ১৪তম ব্রিগেডের অবস্থানে নতুন করে খাবারের চালান পৌঁছেছে। পরিস্থিতি অনুকূল হলে সৈন্যদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হবে।


